পৌর ভবন থেকে সংসদে, ঠাকুরগাঁওয়ের মির্জা পরিবারের ধারাবাহিকতায় ফয়সল আমীন

পৌর ভবন থেকে জাতীয় সংসদ, মির্জা পরিবারের এই চেনা পথেই এবার হাঁটলেন মির্জা ফয়সল আমীন।
ঠাকুরগাঁও-১ আসনের উপনির্বাচনে জয়ের পর মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) দুপুর ১২টায় তিনি সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নেন।
সংসদ সচিবালয়ের সচিব গোলাম সরওয়ার ভুঁইয়ার সঞ্চালনায় স্পিকারের কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত শপথ অনুষ্ঠানে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ তাঁকে এবং সংরক্ষিত নারী আসনে নির্বাচিত এলিজা জামানকে শপথবাক্য পাঠ করান।
অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ উপস্থিত ছিলেন।
গত ২৯ অক্টোবরের উপনির্বাচনে ধানের শীষ প্রতীকে লড়ে বেসরকারি ফলাফলে মির্জা ফয়সল পান ২ লাখ ২৭ হাজার ৭৮৯ ভোট। নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামীর দেলাওয়ার হোসেন পান ৯৬ হাজার ৪৫৩ ভোট। ব্যবধান ১ লাখ ৩১ হাজার ৩৩৬ ভোট।
আসনটি শূন্য হয়েছিল মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বাংলাদেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ায়। তিনি চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারির ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এ আসন থেকে নির্বাচিত হয়েছিলেন।
ব্রিটিশ আমল থেকেই ঠাকুরগাঁওয়ে “রাজনৈতিক পরিবার” হিসেবে পরিচিত মির্জা পরিবার। ফয়সলের বাবা মির্জা রুহুল আমিন পাকিস্তান আমলে ১৯৬২–৬৬ সালে পরপর দুইবার প্রাদেশিক আইনসভার সদস্য হন। তিনি ১৭ বছর ঠাকুরগাঁও পৌরসভার মেয়র ছিলেন এবং ১৯৭৯ ও ১৯৮৮ সালে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে এরশাদ আমলে কৃষি, সমাজকল্যাণ এবং মৎস্য ও পশুসম্পদ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর চাচা মির্জা গোলাম হাফিজ ছিলেন বিএনপির প্রতিষ্ঠাকালীন নেতা, সাবেক স্পিকার এবং আইন ও ভূমিমন্ত্রী।
বড় ভাই মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সরকারি চাকরি ছেড়ে ১৯৮৮ সালে পৌর মেয়র হয়ে রাজনীতিতে আসেন। পরে মেয়র, এমপি ও মন্ত্রী হয়ে এখন তিনি বঙ্গভবনে। ফলে এ মুহূর্তে জেলার রাজনীতিতে পরিবারের নেতৃত্বে রয়েছেন ফয়সল আমীন।
১৯৬৩ সালের ২৬ ডিসেম্বর ঠাকুরগাঁও শহরের কালীবাড়ি এলাকায় জন্ম নেওয়া ফয়সল সাত ভাই-বোনের মধ্যে সবার ছোট। মা ফাতেমা বেগম। তিনি ঠাকুরগাঁও সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি, ঢাকা কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েন। আইএফআইসি ব্যাংকে চাকরি দিয়ে কর্মজীবন শুরু করলেও ১৯৯১ সালে তা ছেড়ে ঠাকুরগাঁওয়ে ফিরে বিএনপির সাংগঠনিক কাজে সক্রিয় হন। ১৯৭৯ সালে বাবার নির্বাচনী প্রচারণায় অংশ নেওয়ার মধ্য দিয়েই তাঁর রাজনীতির হাতেখড়ি। আওয়ামী লীগ আমলেই ২০১৫ সালের ৩০ ডিসেম্বরের পৌর নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে তিনি মেয়র পদে লড়েন। অনিয়মের অভিযোগে স্থগিত তিনটি কেন্দ্রে পুনর্ভোটের পর ২০১৬ সালের জানুয়ারিতে বিজয়ী ঘোষিত হন; পান ১৯ হাজার ১৮৪ ভোট, নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ১২ হাজার ৭৪৪। ২২ ফেব্রুয়ারি দায়িত্ব নিয়ে ২০২১ সাল পর্যন্ত মেয়র ছিলেন। ২০১৬ সালের আগস্টে তিনি বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য হন। পরের বছর ২৪ মে জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হয়ে টানা আট বছর দায়িত্ব পালন করেন। ২০২৫ সালের ৮ সেপ্টেম্বর সম্মেলনে সভাপতি নির্বাচিত হন; সাধারণ সম্পাদক হন পয়গাম আলী।
দলীয় নেতা-কর্মীদের ভাষ্য, ফখরুল ঢাকায় জাতীয় রাজনীতিতে ব্যস্ত থাকাকালে স্থানীয় রাজনীতি সামলাতেন ফয়সলই।
ক্রীড়া ও সংস্কৃতি অঙ্গনেও তাঁর সরব উপস্থিতি। চলতি বছর ঠাকুরগাঁও জেলা ক্রীড়া সংস্থার কাউন্সিলর হিসেবে রংপুর বিভাগ থেকে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিসিবি পরিচালক নির্বাচিত হন এবং ৯ জুন বোর্ডের প্রথম সভায় ডিসিপ্লিনারি কমিটির ভাইস চেয়ারম্যান হন। তিনি নিশ্চিন্তপুর থিয়েটার ও অ্যাপোলো ইলেভেন ক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা এবং ঠাকুরগাঁও নাট্য সমিতি ও টাউন ক্লাবের সঙ্গেও যুক্ত।
স্থানীয়রা জানান, প্রচারণায় ফয়সল বড় ভাইয়ের সময়ের উন্নয়ন উদ্যোগের কথা তুলে ধরেন এবং বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা, হাসপাতাল সম্প্রসারণ, বন্ধ বিমানবন্দর চালু ও ইপিজেড স্থাপনের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের অঙ্গীকার করে ভোট চান।
পৌর শহরের সমাজসেবক রফিকুল ইসলাম বলেন, মির্জা রুহুল আমিন ছিলেন ঠাকুরগাঁওয়ের মাটি ও মানুষের নেতা, পরিবারটি সেই ঐতিহ্য ধরে রেখেছে। তাঁর প্রত্যাশা, ফয়সল বাবা ও ভাইয়ের মতোই জনগণের উন্নয়নে কাজ করবেন।
স্কুলজীবনের বন্ধু ও স্থানীয় সাংবাদিক জাকির মোস্তাফিজ মিলু বলেন, ফয়সল ভালো ছাত্র ছিলেন এবং একজন ভালো আবৃত্তিকার, লেখক ও বক্তা। বাইরে থেকে তাঁর ভেতরটা বোঝা কঠিন, তবে হৃদয় অনেক বড়। নির্বাচিত হওয়ার পরদিনই প্রবল প্রতিপক্ষকে জড়িয়ে ধরে ভুল ধরিয়ে দেওয়ার আহ্বান জানানো তাঁর রাজনৈতিক পরিপক্বতার প্রমাণ।
বিএনপির রংপুর বিভাগীয় সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক অধ্যাপক আমিনুল ইসলাম, যিনি প্রচারণায় শহর-গ্রামে ঘুরেছেন, বলেন, ঠাকুরগাঁওয়ের মানুষ ঐতিহ্যবাহী এই পরিবারকে আপন করে নিয়েছে। ফখরুল ইসলাম আলমগীর মন্ত্রী থাকাকালে অল্প সময়েই মেডিকেল কলেজ, ইপিজেড ও বিমানবন্দরের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প হাতে নিয়েছিলেন। সেগুলো বাস্তবায়নের আশাতেই মানুষ ধানের শীষে বিপুল ভোট দিয়েছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
