যমুনা প্রতিদিন
আমাদের সাথে যুক্ত থাকুন
মঙ্গলবার, ৩ নভেম্বর, ২০২৬
শিরোনাম
লিঙ্ক কপি হয়েছে!

ঢামেকে অ্যাম্বুলেন্স ধর্মঘট : মরদেহ ও মুমূর্ষু রোগী নিয়ে স্বজনদের হাহাকার

নাহিন খান, ঢাকা : প্রকাশিত: ২৮ অক্টোবর ২০২৬, ০৬:২৯ পিএম

ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে সুনির্দিষ্ট পার্কিংয়ের দাবিতে বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্স মালিকদের আকস্মিক ধর্মঘটে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন হাজারো রোগী ও তাদের স্বজনরা।

হাসপাতাল প্রাঙ্গণ থেকে অ্যাম্বুলেন্স সরিয়ে নেওয়ায় সকাল থেকে দুপুর গড়িয়ে গেলেও কোনো আ্যম্বুলেন্স মিলছে না। ফলে মরদেহ বাড়ি নিয়ে যাওয়া কিংবা গুরুতর আহত ও অক্সিজেন-নির্ভর মুমূর্ষু রোগীকে জরুরি ভিত্তিতে অন্য হাসপাতালে স্থানান্তর করতে না পেরে স্বজনদের হাহাকারে ঢামেক প্রাঙ্গণ এক হৃদয়বিদারক স্থানে পরিণত হয়েছে।

আজ বুধবার ২৮ অক্টোবর সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত ঢামেক হাসপাতালের জরুরি বিভাগের পুরাতন ভবন নতুন ভবন এবং বহির্বিভাগের সামনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও কোনো অ্যাম্বুলেন্সের ব্যবস্থা করতে পারেননি ভুক্তভোগীরা। জাতীয় জরুরি সেবা ‘৯৯৯’-এ কল করেও কোনো সাহায্য মেলেনি বলে অভিযোগ অনেকের।

সকাল ৭টায় ডেমরা থেকে আসা মোঃ হৃদয়ের মা ঢামেক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। তিনি জানান, ভাই সকাল থেকে দুপুর পার হয়ে গেলেও মায়ের মরদেহ নিয়ে বাড়ি ফেরার কোনো গাড়ি পাচ্ছিনা।

দিশেহারা হৃদয় বলেন, “৩ দিন আগে মাকে ভর্তি করেছিলাম। সকাল ৭টায় মা মারা গেছেন। এখন দুপুর হয়ে গেছে, একটা অ্যাম্বুলেন্স পাচ্ছি না। আমরা পুরো দিশেহারা, কী করব বুঝতে পারছি না।”

একই রকম সংকটে পড়েছেন সড়ক দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত এক তরুণীর ভাই রেজাউল। মাওয়া থেকে ঢাকা আসার পথে ট্রাকের ধাক্কায় তার বোন গুরুতর আহত হন। গত রাত ১২টায় তাকে ঢামেকে আনা হয়। চিকিৎসকরা তাকে জরুরি ভিত্তিতে জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠানে (পঙ্গু হাসপাতাল) স্থানান্তরের পরামর্শ দেন।

রেজাউল ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “৯৯৯-এ কল দিয়ে কথা বলেছি এবং সরাসরি কথা বলেছি। তারা বলছে গাড়ি চলবে না, আমরা যাব না। এখন বাজে দুপুর ২ টা। এত চেষ্টা করেও বোনকে অন্য হাসপাতালে নেওয়ার মতো কোনো গাড়ি পাচ্ছি না।”

ভোলা থেকে আসা দিনমজুর খালুর গলার হাড় ভেঙে যাওয়ায় তাকে নিয়ে এসেছেন মো. জাহাঙ্গীর আলম। রোগীকে বাঁচাতে জরুরি ভিত্তিতে ইবনে সিনা হাসপাতালে নিয়ে এমআরআই করানো প্রয়োজন। কিন্তু সকাল ৭টা থেকে দুপুর পর্যন্ত অ্যাম্বুলেন্স না পেয়ে জাহাঙ্গীর বলেন, “আমার খালু গাছ থেকে পড়ে গিয়েছেন, হাঁটতে-চলতে পারেন না। রোগীকে অন্য হাসপাতালে নেওয়া দরকার, কিন্তু অ্যাম্বুলেন্সের অভাবে নিতে পারছি না।” আপনারা একটা সমাধান দেন।

এদিকে চাঁদপুর থেকে আসা আক্তার জানান, তার বাবা স্ট্রোক করায় এক সপ্তাহ ধরে ঢামেকে ভর্তি। আজ সকালে তাকে চাঁদপুরে গ্রামের বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার কথা থাকলেও কোনো অ্যাম্বুলেন্স ম্যানেজ করা সম্ভব হয়নি। সারাদিন ধরে বসে আছি।

সকাল ১০টায় নোয়াখালীর এক বাসিন্দা আলমের মামা মারা যান ঢামেক হাসপাতালে। মরদেহ গ্রামের বাড়ি নেওয়ার জন্য অ্যাম্বুলেন্স চালকদের সাথে যোগাযোগ করা হলে তারা সাফ জানিয়ে দেন, “যেভাবে খুশি সেভাবে নিয়ে যান, আমরা কী করব।” নিরুপায় হয়ে স্বজনরা সিএনজিচালিত অটোরিকশায় করে মরদেহ বাসস্ট্যান্ডে নিয়ে যাওয়ার এবং সেখান থেকে বাসে করে নোয়াখালী পাঠানোর মর্মান্তিক সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছেন।

শরীয়তপুরের সাঈদ মৃধা জানান, তার বয়োবৃদ্ধ নানিকে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র দেওয়া হয়েছে। কিন্তু রোগী সম্পূর্ণ অক্সিজেন-নির্ভর। অক্সিজেন সিলিন্ডারসহ অ্যাম্বুলেন্স ছাড়া তাকে শরীয়তপুর নেওয়া কোনোভাবেই সম্ভব নয়। সকাল ৯টা থেকে দুপুর পর্যন্ত খুঁজেও তারা কোনো গাড়ি পাননি।

বাংলাদেশ বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্স মালিক কল্যাণ সমবায় সমিতির সেন্ট্রাল কমিটির সাধারণ সম্পাদক বাদল মাতবর আন্দোলনের যৌক্তিকতা তুলে ধরে বলেন, আজকে যা কথা বললা পার্কিং এর ব্যাপারে সে ব্যাপারে কোন সুরাহা করতে পারিনি। পরিচালক সাহেব আমাদেরকে বলেছে ইমারজেন্সির সামনে রাস্তায় গাড়ি পার্ক করতে। আমাদেরকে বাইরেই থাকতে বলছে তারা। শাহবাগ থানার ওসি ছিলেন তিনি বলেছেন এই বিষয়টি দেখবেন। আমরা চাইনা অনেক সমস্যা হোক। রোগীরা বিপাকে পড়ুক। এখন সন্ধায় আমাদের নেতাকর্মীদের সাথে মিটিং করে আমরা পরবর্তী সিদ্ধান্ত নিব। ঢাকা মেডিকেলের প্রায় ৪ হাজার রোগীর সেবার জন্য আমাদের ১২০ থেকে ১৩০টি অ্যাম্বুলেন্স নিয়োজিত থাকে। কিন্তু আমাদের সুনির্দিষ্ট কোনো পার্কিংয়ের জায়গা দেওয়া হচ্ছে না। রাস্তায় গাড়ি রাখলেই পুলিশ এসে মামলা দেয়, ডাম্পিংয়ে পাঠায়। বর্তমানেও আমাদের একটি গাড়ি শাহবাগ থানায় ডাম্পিংয়ে আছে। আমরা সরকারকে রাজস্ব দিতে রাজি, কিন্তু আমাদের সুনির্দিষ্ট পার্কিং দিতে হবে।”

তিনি আরও অভিযোগ করেন, হাসপাতালের পুরনো ভবনে তাদের একটি জায়গা দেওয়া হয়েছিল, যা তারা নিজেদের খরচে সংস্কার করেছিলেন। কিন্তু একদিন ‘বাইরের গাড়ি’র অজুহাতে তাদের সব গাড়ি সেখান থেকে বের করে দেওয়া হয়।

বাদল মাতবর আরো অভিযোগ করে বলেন, “রোগীদের কষ্টের কথা স্বীকার করে এই নেতা বলেন, “এখানে আমার মা-বোন বা পরিবারও থাকতে পারত। আমাদের নিজেদেরও খুব খারাপ লাগছে। কিন্তু আমরা বাধ্য হয়ে এই আন্দোলন করছি। তবে আমাদের দাবি না মানা পর্যন্ত এই আন্দোলন চলবে।, শুধু ঢাকা মেডিকেল নয়, এভাবে চলতে থাকলে পুরো ঢাকা সিটির অ্যাম্বুলেন্স চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হবে।”

এই ব্যাপারে বাংলাদেশ বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্স মালিক কল্যাণ সমবায় সমিতির প্রধান উপদেষ্টা গোলাম মোস্তফা ফুয়াদ জানান, আমরাও মানুষ, আমরা চাইনা সাধারণ রোগীদের কোন অসুবিধা হোক। আমরা তো মানুষের সেবার জন্য কাজ করি। তবে আমাদের দাবি না মানা পর্যন্ত আমাদের ধর্মঘট অব্যাহত থাকবে। এদিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ঘুরে রোগীদের দুর্ভোগ এর চিত্র ফুটে ওঠে। দেখা যায় কেও সিএনজি কেও কাভার্ড ভ্যানে করেও মরদেহ নিচ্ছে

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এ কে এমন মোঃ ফরহাদ হোসেন বিকেল ৪ টার দিকে সাংবাদিকদেরকে বলেন, ঢামেকে রোগী আনা নেয়া করার জন্য সরকারী নিয়ম অনুযায়ী কোন বেসরকারি আ্যম্বুলেন্স গুলো রাখার কোন বিধান নাই,কোন নিয়ম নাই। উপর মহল থেকেও এমন কথা বলা হয়েছে আমাদের। একটু আগে শাহবাগ থানার ওসি সহ সংগঠনের নেতাদের সাথে মিটিং করেছি। ওসি সাহেবকে বলেছি তিনি বিষয়টি দেখবেন। এর আগে যেমন তারা বিজনেস করতো এখনো করবে তাদেরকে নিষেধাজ্ঞা দেয়া হচ্ছে না। তবে হাসপাতালের মধ্যে তাদের জায়গা দেয়া হবেনা। তারা বাইরে থাকবে। আমরা ৭ দিন সময় নিয়েছি। তিনি বলেন শাহবাগ থানার ওসি সাহেবকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। তাদের পরবর্তী ধাপগুলো তিনি দেখবেন। তবে শেষকথা হলো সরকারী কোন যায়গায় বেসরকারী কোন আ্যম্বুলেন্স থাকবেনা।

তিনি আরো জানান, আমরা উপর মহলে কথা বলেছি আমরা আশা করছি রোগীদের সেবায় জন্য আরো বেশ কিছু আ্যম্বুলেন্স ঢাকা মেডিকেলে যুক্ত হবে বলে আশা করছি।

তবে এমন রোগীদের ভোগান্তি নিয়ে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন এই ব্যাপারে আমার কাছে কোন লিখিত কমপ্লেইন করেনি।

এদিকে পার্কিং জটিলতার দ্রুত নিরসন না হলে ঢামেকসহ রাজধানীর চিকিৎসা সেবায় বড় ধরনের বিপর্যয় নেমে আসতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।