রাজশাহীর হিমাগারে আটকে আছে লাখ লাখ বস্তা আলু, শঙ্কায় চাষিরা

নতুন আলু বাজারে উঠতে আর মাত্র কয়েক মাস বাকি। অথচ রাজশাহীর হিমাগারগুলোতে এখনো পড়ে আছে গত মৌসুমের অর্ধেকেরও বেশি আলু। উৎপাদন ও সংরক্ষণ খরচের তুলনায় বাজারে আলুর দাম অনেক কম। আলু বাজারে বিক্রি হয় মাত্র ৮ থেকে ১২ টাকায়। অথচ এর উৎপাদন খরচ প্রায় ২৫ থেকে ২৭ টাকা। ফলে প্রতি কেজিতে লোকসান গুনতে হচ্ছে ১২ থেকে ১৫ টাকা।
একদিকে হিমাগারে আটকে আছে লাখ লাখ বস্তা আলু, অন্যদিকে সংরক্ষণের সময়সীমা শেষ হয়ে আসছে। বাজারে বিক্রি করলেও লোকসান, হিমাগার থেকে বের না করলেও বিপদ। এমন পরিস্থিতিতে পুঁজি হারিয়ে পথে বসার শঙ্কায় রয়েছেন রাজশাহীর আলুচাষি ও ব্যবসায়ীরা। তাদের আশঙ্কা, চলমান লোকসানের ধাক্কায় আগামী মৌসুমে আলুর আবাদও কমে যেতে পারে।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বর্তমানে বাজারে লাল আলু বিক্রি হচ্ছে কেজিপ্রতি ৮ থেকে ১২ টাকা এবং সাদা আলু ১১ থেকে ১২ টাকায়। অথচ উৎপাদন, পরিবহন ও হিমাগারে সংরক্ষণসহ প্রতি কেজি আলুতে ব্যয় হয়েছে ২৫ থেকে ২৭ টাকা। অর্থাৎ উৎপাদন ও সংরক্ষণে বিনিয়োগ করা অর্থের অর্ধেকও উঠছে না বিক্রির মাধ্যমে। এতে চাষি ও ব্যবসায়ীদের লোকসানের পরিমাণ প্রতিদিনই বাড়ছে।
রাজশাহী জেলায় মোট ৩৬টি হিমাগার রয়েছে। হিমাগার কর্তৃপক্ষ ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এসব হিমাগারে এখনো ৫০ শতাংশের বেশি আলু মজুত রয়েছে। নতুন আলু বাজারে আসার আগে পুরোনো আলুর এই বিশাল মজুত বিক্রি করতে না পারলে সংকট আরও বাড়বে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এরই মধ্যে আলু সংরক্ষণের সময়সীমা শেষ হয়ে আসছে। সাধারণত ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত হিমাগারে আলু সংরক্ষণ করা হয়। তবে চাষি ও ব্যবসায়ীদের আর্থিক সংকট বিবেচনায় নিয়ে অনেক হিমাগার কর্তৃপক্ষ ডিসেম্বর পর্যন্ত আলু রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আলু বের করা না হলে নিলামে বিক্রি অথবা ফেলে দেওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। এতে লোকসানের পাশাপাশি সংরক্ষিত আলু হারানোর আশঙ্কাও করছেন ব্যবসায়ীরা।
পবা উপজেলার বায়া এলাকার আলু ব্যবসায়ী হেলাল আলী বলেন, আর মাত্র এক মাস। ডিসেম্বরের মধ্যে কোল্ড স্টোরেজ কর্তৃপক্ষ আমাদের আলু নিয়ে যেতে বলেছেন। এই সামান্য সময়ের মধ্যে আমরা এতগুলো আলু কীভাবে নিয়ে যাব? বাজারে আলুর দাম নেই। স্টোরেজে এখনো আমাদের ৬০ শতাংশ আলু রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, আলুর দাম এত কম যে বিক্রি করলেও খরচ উঠছে না। এখন আলু বের করে বিক্রি করলে লোকসান, আর না বের করলে হিমাগার থেকে আলু নিয়ে যাওয়ার চাপ। আমরা দুই দিক থেকেই বিপদে পড়েছি।”
আরেক ব্যবসায়ী সামসুদ্দিন বলেন, গতবার আমি ১৬০ বস্তা আলু কিনেছিলাম। এখনো ৯০ বস্তা আলু স্টোরে পড়ে আছে। সামনে আবার নতুন আলু উঠবে। আমরা দুশ্চিন্তায় আছি। আলুর এই দামে আমাদের অনেক লোকসান হবে।
তিনি জানান, আলু কেনার সময় যে দাম ছিল, এখন তার অর্ধেকও পাওয়া যাচ্ছে না। দীর্ঘদিন ধরে ব্যবসার টাকা হিমাগারে আটকে থাকায় নতুন করে আলু কেনার সামর্থ্যও কমে যাচ্ছে। এতে একদিকে পুরোনো বিনিয়োগের অর্থ ফেরত পাওয়া অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে, অন্যদিকে নতুন মৌসুমে ব্যবসা চালিয়ে যাওয়াও কঠিন হয়ে উঠছে।
ব্যবসায়ীদের পাশাপাশি একই সংকটে পড়েছেন আলুচাষিরাও। উৎপাদন খরচ মেটাতে না পেরে অনেকেই এখন ঋণ ও আর্থিক অনিশ্চয়তার মুখে রয়েছেন।
তানোর এলাকার চাষি রহিম আলী বলেন, আমার তামান্না স্টোরে এখনো ১২০ বস্তা আলু আছে। ২০০ বস্তা রেখেছিলাম। হাতে আছে মাত্র এক মাস। এই এক মাসে এতগুলো আলু কোথায় বিক্রি করব? এত লোকসান কি মেনে নেওয়া যায়?
তিনি আরও বলেন, আলু চাষ করে লাভের আশায় টাকা খরচ করেছিলাম। এখন সেই টাকা উঠছে না। আলু বিক্রি করে খরচের টাকা না পেলে পরের মৌসুমে কীভাবে চাষ করব, সেই চিন্তায় আছি।
ব্যবসায়ীদের আশঙ্কা, কয়েক বছর ধরে ধারাবাহিক লোকসানের কারণে আগামী মৌসুমে আলুর আবাদ কমিয়ে দিতে পারেন অনেক চাষি। কারণ, উৎপাদিত আলুর ন্যায্যমূল্য না পেয়ে তাদের হাতে নতুন করে চাষাবাদের জন্য প্রয়োজনীয় মূলধন থাকছে না। এতে আগামী মৌসুমে আলুর উৎপাদন ও বাজারে সরবরাহের ওপরও প্রভাব পড়তে পারে।
পবা উপজেলার তকিপুর আসমা কোল্ড স্টোরেজের ম্যানেজার আশরাফ আলী বলেন, আমাদের কোল্ড স্টোরেজে এক লাখ ৪০ হাজার বস্তা আলুর ধারণক্ষমতা। বর্তমানে ভেতরে আলু আছে প্রায় ৫৬ হাজার বস্তা। আমরা ব্যবসায়ীদের কথা চিন্তা করে ডিসেম্বর পর্যন্ত আলু রাখব। এর মধ্যে সব ব্যবসায়ীকে নোটিশ দেওয়া হবে, যাতে তারা আলু বের করে নেন।
অন্যদিকে রহমান স্পেশাল কোল্ড স্টোরেজের ম্যানেজার আব্দুল খালেক বলেন, আমাদের স্টোরে ৫ লাখ ৭৫ হাজার বস্তা আলু ধারণক্ষমতার মধ্যে বর্তমানে আলু রয়েছে ২ লাখ ৪৫ হাজার বস্তা। ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত আলু সংরক্ষণের সময়সীমা রয়েছে। আমরা আশা করছি, ব্যবসায়ীরা তার আগেই আলু নিয়ে যাবেন। তবে কিছুদিন থেকে আলু ভালোই বের হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, রাজশাহীর আলু খাত এখন বড় ধরনের আর্থিক সংকটের মুখে। হিমাগারে পড়ে থাকা বিপুল পরিমাণ আলু, উৎপাদন ও সংরক্ষণ ব্যয়ের তুলনায় অস্বাভাবিক কম বাজারদর এবং সংরক্ষণের সময়সীমা ঘনিয়ে আসায় অনিশ্চয়তায় দিন কাটছে চাষি ও ব্যবসায়ীদের।
রাজশাহী জেলা আলু ও কাঁচামাল ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক ইফতেখারুল ইসলাম ডনি বলেন, বিগত দুই বছর ধরে আলুচাষিরা আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন। এ বছরও একই ঘটনা। বাজারে বর্তমানে আলুর কেজি ১৪ টাকা। কিন্তু আমরা ব্যবসায়ীরা দাম পাচ্ছি ১০ টাকারও নিচে।
তিনি বলেন, আলু যখন স্টোর থেকে বের করা হয়, তখন বস্তা থেকে বাছাই করে অনেক খারাপ আলু বাদ দিতে হয়। এভাবে আলুর দাম ১০ টাকারও নিচে চলে আসে। অথচ উৎপাদন ও সংরক্ষণ খরচ মিলিয়ে প্রতি কেজিতে ২৫ থেকে ২৭ টাকা ব্যয় হয়েছে। ফলে ব্যবসায়ীরা যেমন লোকসান করছেন, তেমনি চাষিরাও তাদের উৎপাদন খরচ তুলতে পারছেন না।
আলু বিদেশে রপ্তানি করা গেলে বাড়তি দাম পাওয়া সম্ভব কি না, জানতে চাইলে তিনি বলেন, আলু রপ্তানি করা অনেকটা আমলাতান্ত্রিক জটিলতার বিষয়। এই স্বল্প সময়ে বিদেশে রপ্তানি করাও যাবে না। আমাদের এখানে যেসব আলু আছে, সেগুলো রপ্তানির উপযোগী মানের নয়। রপ্তানিযোগ্য আলুর গুণগত মান ভালো প্রয়োজন। কিন্তু এখন সেই সময়টা নেই।
তিনি আরও বলেন, আলুচাষিরা এবারও আর্থিক ক্ষতির মধ্যে পড়ে গেছেন। অনেকে ব্যবসার মূলধন হারিয়ে পথে বসার উপক্রম হয়েছেন।
সুত্র : জাগোনিউজ২৪
