যমুনা প্রতিদিন
আমাদের সাথে যুক্ত থাকুন
রবিবার, ৮ নভেম্বর, ২০২৬
শিরোনাম
• রাজশাহীর তালাইমারিতে জামায়াতের দাওয়াতি অভিযান অনুষ্ঠিত • চৌদ্দরশি একতা যুব সংঘের উদ্যোগে ফাইনাল ফুটবল টুর্নামেন্টে অনুষ্ঠিত • সমবায়ের মাধ্যমে গ্রামীণ অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করে সুখী বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব : রুহুল কবির রিজভী • দূর্গাপুরে জাতীয় সমবায় দিবস-২০২৬ উদযাপিত • ডিএমসিএইচ-এ নার্সিং কর্মকর্তাদের ৮ম বর্ষপূর্তি উদযাপন : রোগীদের জন্য ১০টি হুইল চেয়ার উপহার ও বৃক্ষরোপণ • বাংলাদেশ তৃণমূল প্রেস সোসাইটির ৩১ সদস্যবিশিষ্ট আংশিক কেন্দ্রীয় কমিটি ঘোষনা • মান্দায় জাতীয় সমবায় দিবস পালন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির আহ্বান এমপি টিপুর • বীনাপাণি যাত্রাপার্টি গোপালগঞ্জ পৌরকমিটি কতৃক আনন্দ ভ্রমন ও প্রীতি ভোজ
লিঙ্ক কপি হয়েছে!

নিরাপদ ও বাসযোগ্য দেশ গড়তে বিজ্ঞানের প্রয়োজনীয়তা : লায়ন গনি মিয়া বাবুল

লায়ন মোঃ গনি মিয়া বাবুল : প্রকাশিত: ৮ নভেম্বর ২০২৬, ০২:১৯ পিএম

বিজ্ঞান শুধু পরীক্ষাগারের গবেষণা, জটিল সূত্র কিংবা প্রযুক্তির নতুন আবিষ্কারের নাম নয়। নিরাপদ পানি, ভালো ফসল, রোগের সঠিক চিকিৎসা, দুর্যোগের আগাম সতর্কতা এবং নির্ভরযোগ্য তথ্য এসবের সঙ্গেও বিজ্ঞান সরাসরি জড়িত। মানুষের জীবনকে নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ করা, সমাজে বৈষম্য কমানো এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য নিরাপদ ও বাসযোগ্য দেশ গড়ার কাজে সবসময় বিজ্ঞানের প্রয়োজন।

প্রতি বছর ১০ নভেম্বর শান্তি ও উন্নয়নের জন্য ‘ বিশ্ব বিজ্ঞান দিবস ‘ পালিত হয়। দিবসটি বিজ্ঞানের সামাজিক ভূমিকা তুলে ধরে এবং বিজ্ঞান নিয়ে জনসম্পৃক্ত আলোচনার সুযোগ তৈরি করে। UNESCO-র মতে, বিজ্ঞানকে সমাজের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত করা এবং নাগরিকদের বিজ্ঞান বিষয়ে অবহিত রাখা এ দিবসের গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য। ২০২৬ সালে বিশ্ব বিজ্ঞান দিবস- এর প্রতিপাদ্য “Common ground through science diplomacy” (বিজ্ঞান কূটনীতির মাধ্যমে সাধারণ ভিত্তি)।

বাংলাদেশের জন্য বিজ্ঞানচর্চার গুরুত্ব বিশেষভাবে ব্যপক। ঘনবসতিপূর্ণ এই দেশে উন্নয়নের চ্যালেঞ্জ যেমন বড়, তেমনি সম্ভাবনাও বিপুল। জলবায়ু পরিবর্তন, বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, নদীভাঙন, নগরদূষণ, খাদ্যনিরাপত্তা ও জনস্বাস্থ্য প্রতিটি ক্ষেত্রেই প্রয়োজন স্থানীয় বাস্তবতা বোঝে এমন জ্ঞান ও কার্যকর সমাধান। বিদেশে উদ্ভাবিত প্রযুক্তি নিজ দেশের মাটি, পানি, আবহাওয়া, অর্থনীতি ও মানুষের প্রয়োজনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে প্রয়োগ করলেই কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যায়। এই জন্যেও বিজ্ঞান সম্পর্কে সচেতন থাকা প্রয়োজন।

কৃষিতে বিজ্ঞানের অবদান বাংলাদেশের মানুষের প্রতিদিনের জীবনে দৃশ্যমান। উন্নত বীজ, মাটির স্বাস্থ্য পরীক্ষা, রোগবালাই শনাক্তকরণ, সেচের দক্ষ ব্যবহার এবং আবহাওয়ার তথ্য কৃষকের উৎপাদন ও আয় বাড়াতে পারে। তবে উন্নত প্রযুক্তি যেন কেবল বড় খামার বা শহরের নাগালে সীমাবদ্ধ না থাকে। ক্ষুদ্র কৃষক, নারী কৃষক এবং প্রান্তিক অঞ্চলের মানুষের কাছে সহজ ভাষায় পরামর্শ পৌঁছানো জরুরি। গবেষক, কৃষি সম্প্রসারণকর্মী ও কৃষকের মধ্যে নিয়মিত যোগাযোগ থাকলে মাঠের সমস্যা গবেষণার বিষয় হবে, আর গবেষণার ফলও দ্রুত মাঠে কাজে লাগবে।

জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবিলায় বিজ্ঞানকে আরও কার্যকরভাবে কাজে লাগানো দরকার। উপকূলে লবণাক্ততা, নদী ও হাওর এলাকায় বন্যা, উত্তরাঞ্চলে খরা এবং শহরে জলাবদ্ধতা সব সমস্যার ধরন এক নয়। তাই অঞ্চলভিত্তিক তথ্য সংগ্রহ, ঝুঁকির মানচিত্র তৈরি, আগাম পূর্বাভাস এবং স্থানীয়ভাবে উপযোগী অবকাঠামো পরিকল্পনা প্রয়োজন। ঘূর্ণিঝড়ের সতর্কবার্তা যদি সহজ ভাষায় ও সময়মতো মানুষের কাছে পৌঁছায়, আশ্রয়কেন্দ্রে যাওয়ার পথ জানা থাকে, এবং আশ্রয়কেন্দ্র শিশু, নারী, বয়স্ক ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের উপযোগী হয় তবে বিজ্ঞান মানুষের জীবন রক্ষার শক্তিতে পরিণত হয়।

জনস্বাস্থ্যেও বিজ্ঞান ও জনবিশ্বাসের সম্পর্ক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রোগ শনাক্তকরণ, টিকা, ওষুধ, পুষ্টি, নিরাপদ মাতৃত্ব এবং মানসিক স্বাস্থ্য এসব ক্ষেত্রে গবেষণাভিত্তিক সিদ্ধান্ত মানুষের সুস্থতা বাড়ায়। একই সঙ্গে স্বাস্থ্যসংক্রান্ত ভুল তথ্য ও গুজব প্রতিরোধে চিকিৎসক, গবেষক, গণমাধ্যম ও স্থানীয় নেতৃত্বকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। মানুষকে শুধু নির্দেশ দিলে হবে না, কেন কোন পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে, তার যুক্তিও সহজভাবে বোঝাতে হবে। বিজ্ঞানভিত্তিক তথ্য যখন মানুষের অভিজ্ঞতা ও ভাষার সঙ্গে যুক্ত হয়, তখন স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণে আস্থা বাড়ে।

টেকসই উন্নয়নের আরেকটি বড় শর্ত হলো পরিচ্ছন্ন পরিবেশ। বায়ুদূষণ, প্লাস্টিক বর্জ্য, দূষিত নদী এবং অপরিকল্পিত নগরায়ণ মানুষের স্বাস্থ্য ও জীবিকার ওপর নেতিবাচক চাপ তৈরি করে। এসব সমস্যা মোকাবিলায় নির্ভরযোগ্য পরিবেশগত তথ্য, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার উন্নত পদ্ধতি, পরিচ্ছন্ন জ্বালানি, নিরাপদ গণপরিবহন ও পণ্যের মান নিয়ন্ত্রণ দরকার। বিজ্ঞান এখানে সমস্যার পরিমাপ করতে সাহায্য করে, আর নীতি ও নাগরিক উদ্যোগ সেই সমস্যার সমাধান বাস্তবায়ন করে। ঢাকার বায়ুর মান বা নদীর দূষণ নিয়ে তথ্য প্রকাশ করাই যথেষ্ট নয়, সেই তথ্যের ভিত্তিতে নিয়মিত পদক্ষেপ নেওয়া এবং ফলাফল জনসমক্ষে জানানোও জরুরি।

প্রযুক্তির দ্রুত অগ্রগতির সঙ্গে বাংলাদেশের সামনে নতুন সুযোগ তৈরি হয়েছে। ডিজিটাল সেবা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, মোবাইল যোগাযোগ ও তথ্য বিশ্লেষণ শিক্ষা, কৃষি, ব্যবসা এবং সরকারি সেবাকে আরও সহজ করতে পারে। কিন্তু প্রযুক্তির সুফল সবার কাছে পৌঁছাচ্ছে কি না, সেটিও দেখতে হবে। গ্রাম ও শহরের ডিজিটাল ব্যবধান, ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তা, অনলাইন প্রতারণা এবং কর্মসংস্থানের পরিবর্তন নিয়ে দায়িত্বশীল আলোচনা প্রয়োজন। মানুষের অধিকার ও মর্যাদা রক্ষা না করে প্রযুক্তিগত অগ্রগতি টেকসই হতে পারে না।

বিজ্ঞানশিক্ষার লক্ষ্যও নতুন করে ভাবা দরকার। মুখস্থনির্ভর পাঠের বদলে প্রশ্ন করা, পর্যবেক্ষণ, পরীক্ষা, যুক্তি দিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং ভুল থেকে শেখার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। বিদ্যালয়ে হাতে-কলমে বিজ্ঞানচর্চা, বিজ্ঞান ক্লাব, স্থানীয় সমস্যা নিয়ে প্রকল্প এবং শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ শিক্ষার্থীদের কৌতূহল বাড়াতে পারে। মেয়ে শিক্ষার্থী, গ্রামীণ শিক্ষার্থী এবং সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর জন্য বিজ্ঞানশিক্ষার সুযোগ বাড়ানো জরুরি। প্রতিভা কোনো নির্দিষ্ট অঞ্চল বা পরিবারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, সুযোগের বৈষম্যই অনেক সম্ভাবনাকে অঙ্কুরে থামিয়ে দেয়।

বিজ্ঞান গবেষণার ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত বিনিয়োগ ও গবেষকের স্বাধীনতা থাকা প্রয়োজন। বিশ্ববিদ্যালয়, সরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান, শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও স্থানীয় উদ্যোক্তাদের মধ্যে সহযোগিতা বাড়াতে হবে। গবেষণার অর্থায়ন হতে হবে দীর্ঘমেয়াদি ও স্বচ্ছ, তরুণ গবেষকেরা যেন প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি, তথ্য, প্রশিক্ষণ ও প্রয়োজনীয় পরামর্শ পান এসব নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে গবেষণার ফল কেবল প্রতিবেদন বা জার্নালে সীমাবদ্ধ না রেখে কৃষক, চিকিৎসাকর্মী, শিক্ষক, প্রকৌশলী, স্থানীয় সরকার ও শিল্পখাতের কাছে ব্যবহারযোগ্যভাবে পৌঁছাতে হবে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বের মধ্যে গবেষণা, উন্নয়ন, সমন্বয় এবং বিজ্ঞানসেবাকে নাগরিকের কাছে পৌঁছানোর বিষয়গুলো রয়েছে, এগুলোকে বাস্তবায়নে কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন।

শান্তি প্রতিষ্ঠায় বিজ্ঞানের ভূমিকা কেবল নতুন আবিষ্কারে সীমাবদ্ধ নয়, এটি সমাজে আস্থা তৈরিরও উপায়। নির্ভরযোগ্য তথ্য নীতিনির্ধারককে ভালো সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করে, আর স্বচ্ছ তথ্যপ্রবাহ গুজব ও বিভ্রান্তি কমায়। পানি, খাদ্য, স্বাস্থ্য বা পরিবেশের মতো অভিন্ন সমস্যা সমাধানে বিভিন্ন অঞ্চল, প্রতিষ্ঠান ও দেশের মধ্যে জ্ঞান বিনিময় প্রয়োজন। বিজ্ঞান কূটনীতি বলতে সেই সহযোগিতাকেই বোঝায়, যেখানে গবেষণা ও প্রযুক্তি পারস্পরিক বোঝাপড়া এবং যৌথ সমাধানের পথ খুলে দেয়। তবে বিজ্ঞানকে মানুষের কল্যাণে রাখতে হলে গবেষণার নৈতিকতা, তথ্যের স্বচ্ছতা, নিরাপত্তা এবং জনস্বার্থকে সমান গুরুত্ব দিতে হবে।

বাংলাদেশের অগ্রগতির প্রতিটি ধাপে বিজ্ঞানকে মানুষের জীবনের সঙ্গে আরও গভীরভাবে যুক্ত করতে হবে। যে বিজ্ঞান কৃষকের ফসল রক্ষা করে, যে প্রযুক্তি দুর্যোগে প্রাণ বাঁচায়, যে গবেষণা রোগের চিকিৎসা সহজ করে, যে উদ্ভাবন দূষণ কমায় সেই বিজ্ঞানই শান্তি ও টেকসই উন্নয়নের ভিত্তি। বিশ্ব বিজ্ঞান দিবসে আমাদের অঙ্গীকার হোক: বিজ্ঞানচর্চায় বিনিয়োগ বাড়ানো, শিক্ষায় কৌতূহল ও যুক্তিকে উৎসাহিত করা, গবেষণার ফল সবার কাছে পৌঁছানো এবং প্রযুক্তির নৈতিক ব্যবহার নিশ্চিত করা। মানুষ, প্রকৃতি ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কল্যাণে বিজ্ঞানকে কাজে লাগাতে পারলেই গড়ে উঠবে নিরাপদ, বাসযোগ্য, শান্তিপূর্ণ, মানবিক ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ।