তেল-গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধিতে চাপে জনজীবন, বাড়ছে সংসার ও উৎপাদন ব্যয়

রাকিব আলী : দেশে জ্বালানি তেল ও গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে সাধারণ মানুষের মধ্যে। জ্বালানি খাতের বাড়তি ব্যয়ের প্রভাব পড়ছে পরিবহন, শিল্পকারখানা, ব্যবসা-বাণিজ্য, কৃষি ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে। বিশেষ করে রান্নার কাজে ব্যবহৃত তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) দাম ধারাবাহিকভাবে বেড়ে যাওয়ায় মধ্যবিত্ত ও নিম্নআয়ের পরিবারগুলো আর্থিক চাপে পড়ছে। আয়-ব্যয়ের ভারসাম্য রাখতে হিমশিম খাচ্ছেন সীমিত আয়ের মানুষ।
সাম্প্রতিক মূল্য পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, গত সেপ্টেম্বর মাসে দেশের বাজারে জ্বালানি তেলের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা বাড়ানো হয়। বর্তমানে প্রতি লিটার ডিজেল ১৩৫ টাকা, অকটেন ১৬৫ টাকা, পেট্রোল ১৬০ টাকা এবং কেরোসিন ১৫৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। নভেম্বর মাসে এসব জ্বালানি তেলের দাম অপরিবর্তিত রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। তবে এলপিজি গ্যাসের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি ভিন্ন। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) নভেম্বর মাসের জন্য ১২ কেজি বেসরকারি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ২ হাজার ৬০ টাকা নির্ধারণ করেছে, যা অক্টোবর মাসের তুলনায় ২২৩ টাকা বেশি। দুই মাসে এই সিলিন্ডারের দাম বেড়েছে মোট ৪৭৫ টাকা। ফলে রান্নার জ্বালানি কিনতেই বাড়তি অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে পরিবারগুলোকে।
রান্নার খরচে বাড়তি চাপ
দেশের অনেক পরিবারে পাইপলাইনের গ্যাসের পরিবর্তে এলপিজি সিলিন্ডার ব্যবহার করা হয়। বিশেষ করে শহরাঞ্চলের অসংখ্য বাসাবাড়ি, ছোট হোটেল, রেস্তোরাঁ ও খাবারের দোকান এই গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল। সিলিন্ডারের দাম বাড়ার কারণে তাদের মাসিক ব্যয়ও বেড়ে যাচ্ছে। একটি পরিবারকে মাসে এক বা একাধিক সিলিন্ডার কিনতে হলে বাড়তি ব্যয়ের পরিমাণ আরও বেশি হয়।
শুধু বাসাবাড়িই নয়, ছোট খাবারের দোকান, চায়ের দোকান, বেকারি ও রেস্তোরাঁর মালিকদেরও জ্বালানি খরচ সামলাতে হচ্ছে। এসব প্রতিষ্ঠানের পরিচালন ব্যয় বেড়ে গেলে খাবারের দাম বাড়ানোর প্রবণতা তৈরি হয়। এর ফলে শেষ পর্যন্ত সাধারণ ক্রেতাকেই বাড়তি অর্থ গুনতে হয়।
পরিবহন ও পণ্যের বাজারে প্রভাব
জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির অন্যতম বড় প্রভাব পড়ে পরিবহন খাতে। বাস, ট্রাক, পিকআপ, লরি ও অন্যান্য পণ্যবাহী যানবাহনের পরিচালন ব্যয়ের বড় অংশই জ্বালানির পেছনে ব্যয় হয়। তেলের দাম বাড়লে পরিবহন মালিকদের ব্যয় বৃদ্ধি পায়। এর প্রভাব যাত্রী পরিবহন ও পণ্য পরিবহনের খরচে পড়ার আশঙ্কা থাকে।
দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে রাজধানীসহ বড় শহরগুলোতে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ কৃষিপণ্য, মাছ, মাংস, শাকসবজি ও নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী পরিবহন করা হয়। এসব পণ্য বাজারে পৌঁছাতে পরিবহন ব্যয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ফলে জ্বালানি খরচ বেড়ে গেলে পণ্যের উৎপাদনস্থল থেকে বাজার পর্যন্ত সরবরাহ ব্যয়ও বাড়তে পারে।
বিশেষ করে কৃষকরা সেচযন্ত্র, জমি চাষ, ফসল পরিবহন ও উৎপাদনের বিভিন্ন পর্যায়ে জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল। ডিজেলের দাম বাড়লে কৃষি উৎপাদন ব্যয়েও চাপ সৃষ্টি হয়। একইভাবে মাছ চাষ, পোলট্রি ও ক্ষুদ্র শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোও জ্বালানির বাড়তি ব্যয়ের কারণে সমস্যায় পড়তে পারে।
শিল্পকারখানা ও ব্যবসায় নেতিবাচক প্রভাব
দেশের শিল্প ও উৎপাদন খাতেও জ্বালানি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। গ্যাস ও তেলের সরবরাহ, মূল্য এবং ব্যবহারিক সুবিধার ওপর অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠানের উৎপাদন নির্ভর করে। গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধি বা সরবরাহসংক্রান্ত জটিলতা তৈরি হলে উৎপাদন খরচ বেড়ে যায়। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের জন্য বাড়তি ব্যয় বহন করা কঠিন হয়ে পড়ে।
শিল্পকারখানার উৎপাদন ব্যয় বেড়ে গেলে পণ্যের বাজারমূল্য বাড়ানোর চাপ তৈরি হয়। এতে দেশীয় বাজারে পণ্যের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা কমতে পারে। আবার উৎপাদন ব্যয় নিয়ন্ত্রণে রাখতে না পারলে কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান উৎপাদন কমানো কিংবা কর্মসংস্থান সংকোচনের সিদ্ধান্ত নিতে পারে। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে সামগ্রিক অর্থনীতিতে।
আন্তর্জাতিক বাজারের প্রভাব ও দেশের বাস্তবতা
বাংলাদেশ জ্বালানি তেলের একটি বড় অংশ আমদানির মাধ্যমে সংগ্রহ করে। আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম, ডলারের বিনিময় হার, পরিবহন ব্যয় এবং আমদানিসংশ্লিষ্ট অন্যান্য খরচ দেশের জ্বালানি বাজারকে প্রভাবিত করে। মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন অঞ্চলের রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সংঘাতের কারণে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহে অনিশ্চয়তা তৈরি হলে আমদানি ব্যয় বাড়তে পারে।
গত সেপ্টেম্বর মাসে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম ও পরিবহন ব্যয়ের চাপের কথা উল্লেখ করে বাংলাদেশেও জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হয়েছিল। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) আর্থিক লোকসানও এ সিদ্ধান্তের পেছনে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে উঠে আসে। তবে আন্তর্জাতিক বাজারের চাপ থাকলেও দেশের সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বিবেচনায় নিয়ে মূল্য নির্ধারণ করা জরুরি।
সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা
বর্তমান পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষের প্রধান প্রত্যাশা হচ্ছে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজার স্থিতিশীল রাখা এবং জ্বালানি খাতে অযৌক্তিক মূল্যবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণ করা। কারণ জ্বালানির দাম বাড়লে শুধু একটি খাত ক্ষতিগ্রস্ত হয় না; এর প্রভাব ধীরে ধীরে পুরো অর্থনীতিতে ছড়িয়ে পড়ে।
বিশেষ করে নিম্নআয়ের মানুষ, দিনমজুর, রিকশাচালক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও বেসরকারি চাকরিজীবীরা বাড়তি ব্যয়ের কারণে সবচেয়ে বেশি চাপে পড়েন। তাদের অনেকেরই আয় নির্দিষ্ট, কিন্তু বাজারদর ও দৈনন্দিন ব্যয় পরিবর্তিত হচ্ছে। ফলে মাসের শেষ দিকে সংসার পরিচালনা করা কঠিন হয়ে উঠছে।
এ অবস্থায় সরকারের উচিত জ্বালানি খাতের মূল্য নির্ধারণে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা, আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নিয়মিত পর্যালোচনা করা এবং বাজারে অতিরিক্ত মুনাফা বা কৃত্রিম সংকট সৃষ্টির প্রবণতা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা। পাশাপাশি পরিবহন ভাড়া ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন।
এলপিজি সিলিন্ডারের নির্ধারিত মূল্য যাতে ব্যবসায়ীরা যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করেন, সে বিষয়েও কার্যকর তদারকি জরুরি। নিম্নআয়ের মানুষের জন্য প্রয়োজন অনুযায়ী সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি ও জ্বালানি সহায়তা বাড়ানোর বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়া যেতে পারে।
জ্বালানি নিরাপত্তায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা জরুরি
বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি আমদানিনির্ভরতা কমানো, দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলন বাড়ানো, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার সম্প্রসারণ এবং জ্বালানির অপচয় রোধে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। সৌরবিদ্যুৎ, জ্বালানিসাশ্রয়ী প্রযুক্তি ও আধুনিক উৎপাদনব্যবস্থা সম্প্রসারণ করা গেলে ভবিষ্যতে জ্বালানি খাতের ওপর চাপ কিছুটা কমানো সম্ভব।
সর্বোপরি, জ্বালানি তেল ও গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধিকে কেবল অর্থনৈতিক হিসাবের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা, খাদ্যনিরাপত্তা, কর্মসংস্থান ও দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন। তাই জ্বালানি খাতের প্রতিটি সিদ্ধান্তে জনস্বার্থ, অর্থনৈতিক সক্ষমতা ও দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। অন্যথায় জ্বালানির বাড়তি ব্যয়ের বোঝা শেষ পর্যন্ত বহন করতে হবে দেশের সাধারণ মানুষকেই।
লেখক: কবি ও কথাসাহিত্যিক
চেয়ারম্যান: সাউথ এশিয়া ইউনাইটেড অর্গানাইজেশন
