যমুনা প্রতিদিন
আমাদের সাথে যুক্ত থাকুন
সোমবার, ২ নভেম্বর, ২০২৬
শিরোনাম
লিঙ্ক কপি হয়েছে!

ঢাকা মেডিকেলে অ্যাম্বুলেন্স ধর্মঘট : মরদেহের পাশে স্বজনদের আহাজারি

নাহিন খান, ঢাকা : প্রকাশিত: ২৮ অক্টোবর ২০২৬, ০৩:৩৮ এএম

ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে পার্কিংয়ের দাবিতে বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্স মালিকদের আকস্মিক ধর্মঘটে এক মানবিক বিপর্যয় নেমে এসেছে।

একদিকে স্বজন হারানোর তীব্র শোক, অন্যদিকে প্রিয়জনের মরদেহ বাড়ি নিয়ে যাওয়ার আকুল আকুতি—সব মিলিয়ে হাসপাতাল প্রাঙ্গণ এখন এক কান্নার রোল ও চরম অসহায়ত্বের চত্বরে পরিণত হয়েছে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও মিলছে না কোনো অ্যাম্বুলেন্স। নিরুপায় হয়ে অনেকেই সিএনজি, অটোরিকশা কিংবা পিকআপ ভ্যানে করে প্রিয়জনের লাশ নিয়ে ফিরতে বাধ্য হচ্ছেন। একই সাথে গুরুতর অসুস্থ রোগীদের অন্য হাসপাতালে স্থানান্তর করতে না পেরে চোখের সামনে ধুঁকতে দেখছেন অসহায় স্বজনরা।

মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) বিকেলের পর থেকেই ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল প্রাঙ্গণে সৃষ্টি হয় এক হৃদয়বিদারক দৃশ্য।

নতুন ভবনের মেডিসিন বিভাগে চিকিৎসাধীন অবস্থায় বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে মারা যান নারায়ণগঞ্জের ৭০ বছর বয়সী বৃদ্ধা হালিমা বেগম। মৃত্যুর পর পেরিয়ে গেছে দীর্ঘ তিন ঘণ্টা। কিন্তু মাওয়ায় তার মরদেহ নিয়ে যাওয়ার জন্য একটি অ্যাম্বুলেন্সও জোগাড় করতে পারেননি তার নাতি মো. শাহীন।

কান্নাজড়িত কণ্ঠে শাহীন বলেন, ভাইরে কি বলবো “সরকারি হাসপাতালে এসে এমন বিপদে পড়ব তা কোনদিনও ভাবিনি। সরকারি অ্যাম্বুলেন্সের কোনো দেখা নেই, বেসরকারিগুলোও বন্ধ। স্বজন হারানোর শোক ভুলে এখন লাশের পাশে বসে অপেক্ষা করছি। এই কষ্ট কাকে বোঝাব ভাই বলতে পারেন?”

একই ভবনের মেডিসিন বিভাগে বিকেল ৫টার দিকে মারা যান যাত্রাবাড়ীর ২২ বছরের তরুণ মো: রাসেল। মুগদা হাসপাতাল থেকে গুরুতর অবস্থায় তাকে ঢামেকে আনা হয়েছিল উন্নত চিকিৎসার জন্য। কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি। ভাগনের অকালমৃত্যুতে স্তব্ধ মামা মোঃ মনির হোসেন মরদেহের পাশে পাথরের মতো বসে ছিলেন।

তার সাথে কথা বলতে গেলে তিনি জানান, হাসপাতাল থেকে ডাক্তাররা তাকে লাশ ভ্যানে করে নিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন।

মনির হোসেন ক্ষোভ ও দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, “এত বড় সরকারি হাসপাতালে লাশ নেওয়ার একটা গাড়ি পাব না, এটা কল্পনাও করিনি। আমরা এখন সম্পূর্ণ অসহায়।” বিকাল থেকে অসহায় হয়ে বসে আছি ভাই কি ভাবে ভাগনেকে বাড়ি নিয়ে যাবো।

শুধু মরদেহ নয়, এই ধর্মঘটের নিষ্ঠুর শিকার হচ্ছেন জীবিত রোগীরাও। খুলনা থেকে গুরুতর আহত শাশুড়িকে নিয়ে ঢামেকে এসেছিলেন আব্দুল আহাদ। চিকিৎসকরা তাকে জরুরি ভিত্তিতে কিডনি হাসপাতালে রেফার করলেও দুপুরের পর থেকে কোনো অ্যাম্বুলেন্স পাননি তিনি।

আহাদ জানান, সময়মতো আমাদের রোগীকে অন্য হাসপাতালে নিতে না পারলে যেকোনো মুহূর্তে অবস্থা আরও আশঙ্কাজনক হয়ে উঠতে পারে। অথচ কি আশ্চর্য কেউ কোনো সমাধান দিতে পারছে না। তিনি কাকুতি মিনতি করে বলেন, আমরা কি করবো ভাই এখন, আপনারাই আমাদের একটা ব্যবস্থা করে দেন।

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আসা আরেক ভুক্তভোগী (নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জানান), ১৯ দিন ধরে আমাদের রোগী (আইসিইউ) ভর্তি ছিলো। আজকে রাত আনুমানিক ১০ টার দিকে তিনি মারা যান। মারা যাওয়ার পর থেকে আমরা এম্বুলেন্সের সন্ধান করতে থাকি। কিন্তু কোনভাবেই অ্যাম্বুলেন্স পাচ্ছিলাম না। ৯৯৯ কল দিয়েও কোন লাভ হচ্ছিলো না। রাত ১১.৩০ মিনিটের দিকে একটি অ্যাম্বুলেন্সের সন্ধান পাই। তবুও সেটা নিয়েও আমাদের সাথে নাটক হয়। বিভিন্ন রকম প্যানেলের মধ্যে আমরা পড়ছিলাম । যেখানে ৮ হাজার টাকা লাগে সেখানে ১২ হাজার টাকা চাইছে আমাদের কাছে। সবকিছু মিলিয়ে বিষয়টা আমাদের জন্য খুবই হতাশা জনক। এইভাবে যদি চলতে থাকে স্বাস্থ্য ব্যবস্থা কোন দিকে যাবে এটা নিয়েই চিন্তা। আমাদের যদি এইভাবে হ্যাসেলের শিকার হতে হয়। তাহলে কেমন হয়। বিভিন্ন মাধ্যমে আমাদের ঘুরতে হচ্ছিল। কেও বলছে হবে কেও বলছে হবেনা। এক মাধ্যম বলছে ওখানে যান আরেক মাধ্যম বলছে ওখানে যান। এদিকে তাড়া ভাড়ার চেয়ে আরো বেশি ডাবল ভাড়া দাবি করছিলো। আমরা চাই না ঢাকা মেডিকেলে বা যে কোন জায়গায় কেউ এরকম সমস্যার শিকার হোক।

বিকেল থেকে রাত ১২ টা পর্যন্ত ঢাকা মেডিকেল সরজমিন ঘুরে এই সমস্যাগুলো উঠে আসে।

নেপথ্যে পার্কিংয়ের বিরোধ:

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্স মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মোঃ শাহাদাত হোসেন এর কাছে এই বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে তিনি অভিযোগ করে জানান, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নতুন পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এ কে এম মোঃ ফরহাদ হোসেন দায়িত্ব নেওয়ার পর তাদের সব অ্যাম্বুলেন্স হাসপাতাল থেকে বের করে দেওয়া হয়। পরবর্তীতে নতুন ভবনের নিচে পার্কিংয়ের ব্যবস্থা করার আশ্বাস দিয়ে তাদের দিয়ে জায়গাটি পরিষ্কার ও করানো হয় এবং সেখানে সিসি ক্যামেরা ও লাইট স্থাপন করা হয়। কিন্তু রহস্যজনক কারণে সেখান থেকেও গাড়ি সরিয়ে দেওয়া হয়।

তিনি আরো বলেন, “রাস্তায় গাড়ি রাখলে পুলিশ মামলা দেয়, আর হাসপাতালের ভেতরেও আমাদের জায়গা দেওয়া হচ্ছে না। সিসি ক্যামেরা ও গেট স্থাপনে আমাদের কয়েক লাখ টাকা খরচ হয়েছে। আমরা প্রতিটি গাড়ির বিপরীতে সরকারকে রাজস্ব দিতেও রাজি আছি। কিন্তু ভাই একটা কথা” আমাদের দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত আমাদের ধর্মঘট চলবে।”

এদিকে হাসপাতালের ভেতর থেকে কাঙ্ক্ষিত অ্যাম্বুলেন্স না পেয়ে অনেকেই বাইরের অ্যাম্বুলেন্সের খোঁজ করছেন, কিন্তু ধর্মঘটের কারণে সেগুলোও হাসপাতালের ভেতরে ঢুকতে পারছে না।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন হাসপাতাল কর্মচারী অভিযোগ করে জানান, এই অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি নিরসনে হাসপাতালের পরিচালকের উচিত অবিলম্বে অ্যাম্বুলেন্স নেতাদের সাথে আলোচনায় বসে একটি মানবিক সমাধান খোঁজা।

এই চরম অব্যবস্থাপনা ও মানবিক সংকটের বিষয়ে জানতে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এ কে এম ফরহাদ হোসেনের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার সাথে যোগাযোগ করা যায়নি। ফলে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি।

শোকাতুর মানুষের কান্না আর আর্তনাদে ভারী হয়ে ওঠা ঢাকা মেডিকেল প্রাঙ্গণে এখন একটাই প্রশ্ন—আর কতক্ষণ লাশের পাশে বসে এভাবে অপেক্ষা করতে হবে স্বজনদের?