বনানীতে শুরু হয়েছে চিত্রশিল্পী রাশিদ খানের একক চিত্রপ্রদর্শনী ‘নদীলিপি : দ্য রিভার স্ক্রিপ্ট’

নদী আর মানুষের ভেতরের অবচেতন সম্পর্কের গল্প, স্মৃতি ও অনুভূতির গভীরতা নিয়ে রাজধানীতে শুরু হয়েছে বহুমুখী চিত্রশিল্পী রাশিদ খানের একক চিত্রপ্রদর্শনী ‘নদীলিপি: দ্য রিভার স্ক্রিপ্ট (River Script)’।
৫ নভেম্বর (বৃহস্পতিবার) দুপুর ৩টায় রাজধানীর বনানীতে অবস্থিত ঢাকা গ্যালারিতে (বাড়ি ৪৪, সড়ক ১২, ব্লক ই, বনানী, ঢাকা) প্রথাগত কোনো ফিতা কাটাকাটি বা আনুষ্ঠানিকতার অনুশাসন ছাড়াই চিত্রপ্রেমী ও দর্শনার্থীদের স্বাভাবিক উপস্থিতির মধ্য দিয়ে প্রদর্শনীর দ্বার উন্মুক্ত করা হয়।
আগামী ১৫ নভেম্বর পর্যন্ত প্রতিদিন বিকেল ৩টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত প্রদর্শনীটি সকলের জন্য উন্মুক্ত থাকবে।
প্রদর্শনী শুরুর আগের দিন বুধবার বিকেলে আয়োজিত হয় এক বিশেষ প্রাক-প্রদর্শনী বা প্রিভিউ সন্ধ্যা। গ্যালারিতে প্রবেশ করতেই দর্শকরা মুখোমুখি হন এক পরাবাস্তব অভিজ্ঞতার—ছাদ থেকে নেমে আসা বিশাল তামাটে রঙের জাল, যার ফাঁক দিয়ে দেখা যায় ঢেউ খেলানো ফিরোজা জলের ক্যানভাস; পাশেই সাদা-কালো আঁচড়ে আঁকা খরস্রোতা নদীর বিস্তার। বাঁশের তৈরি ঐতিহ্যবাহী মাছ ধরার সরঞ্জাম, হাতে তৈরি কাগজে ছোট ছোট ছবির সঙ্গে শব্দের দ্যোতনা এবং নীল, হলুদ ও পলিমাটির উষ্ণ রঙে আঁকা চিত্রকর্মগুলো দর্শকদের এক অন্যরকম নদীর ভেতর প্রবেশ করায়।
উল্লেখ্য, প্রদর্শনীর প্রথম দিনের প্রিভিউ সন্ধ্যা এবং আজ আনুষ্ঠানিকভাবে উন্মুক্ত হওয়ার দিনে গ্যালারি প্রাঙ্গণে বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ, শিল্পী ও শিল্পপ্রেমীদের সমাগম ঘটে।
এসব আয়োজনে উপস্থিত ছিলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক ও মৃত্তিকা, পানি ও পরিবেশ বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান এবং ফরাসি সরকারের ‘অর্ডার অব মেরিট’ সম্মাননায় ভূষিত ড. এ. এইচ. এম. মোস্তাফিজুর রহমান, সংগীতশিল্পী পিলু খান, বাপ্পা মজুমদার, চিত্রশিল্পী মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান, এস এম ওয়াহিদুজ্জামান, অভিনেত্রী সোহানা সাবা, সামিয়া আফরিন, ভাবনা, ঐশ্বর্য রদ্দি, কবি আলফ্রেড খোকন, সংগীতা খান, চলচ্চিত্র নির্মাতা ফয়সাল রদ্দি, চলচ্চিত্র নির্মাতা এ বি এম নাজমুল হুদা, স্থপতি ইশতিয়াক জহির তিতাস, মমিনুল ইসলাম, সাব্বির রহমান তানিম ও প্রযোজক হাফিজউদ্দীন মুন্নাসহ আরও অনেকে।
প্রদর্শনীর উদ্বোধনী দিনের বিশেষ আকর্ষণ ছিল সান্ধ্যকালীন বিশেষ পর্ব ‘নদী আলাপ’।
অনুষ্ঠানের শুরুতেই নদী বিষয়ক দীর্ঘদিনের গভীর গবেষণা ও জ্ঞান থেকে বক্তব্য রাখেন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ড. এ. এইচ. এম. মোস্তাফিজুর রহমান। তিনি তাঁর গবেষণালব্ধ অভিজ্ঞতা থেকে নদীর সঙ্গে মানুষের চিরন্তন সংযোগ, নদীর অববাহিকায় কীভাবে একেকটি অঞ্চলের সংস্কৃতি, সৃষ্টি ও মানবসভ্যতা গড়ে উঠেছে—তা অত্যন্ত চমৎকারভাবে তুলে ধরেন।
তাঁর এই বক্তব্যে উপস্থিত দর্শকরা গভীরভাবে আপ্লুত হন এবং নদী ও প্রকৃতির সাথে মানবজীবনের যোগসূত্র নিয়ে নতুন অনেক বিষয় জানতে পারেন।
এরপর এই নদী আলাপে যুক্ত হন এস এম ওয়াহিদুজ্জামান, যিনি ঝিনাইদহ ক্যাডেট কলেজে রাশিদ খান যখন পড়তেন তখন তাঁর শিক্ষক ছিলেন এবং রাশিদ খানের আজকের শিল্পী হয়ে ওঠার পেছনে যাঁর অনুপ্রেরণা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। তিনি নদী আলাপে অংশ নেওয়ার পাশাপাশি চমৎকার গান গেয়ে শোনান এবং উপস্থিত সকলকে মুগ্ধ করেন।
চিত্রকর্মগুলো দেখে চিত্রশিল্পী মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান বলেন, “এক কথায় প্রদর্শনীটি চমৎকার। রাশিদ দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছে এবং কাজের প্রতি ওর যে বলিষ্ঠতা ও দক্ষতা, তা ছবিগুলোতে স্পষ্ট। নদীলিপি নামটি ভীষণ অর্থবহ। ছবির পরিবেশনাতেও অভিনবত্ব রয়েছে।”
তাছাড়া অনুভূতি প্রকাশ করে অভিনেত্রী সোহানা সাবা বলেন, “রাশিদের শিল্পকর্মগুলো আমি সবসময়ই খুব পছন্দ করি। সেই জায়গা থেকেই ওর কাজের মূল ভাবনা বা থিমটা আমার ভালো লেগেছে। আসলে আমাদের তো নদীমাতৃক দেশ; এখানে বৃষ্টি, নদী, মাটি এসবের নাম শুনলেই মনের ভেতরে কেমন যেন একটা ভালোলাগা কাজ করে। প্রদর্শনীতে প্রবেশ করার পর মনে হয়েছে যেন সত্যিই নদীর ভেতরে ঢুকে পড়েছি।”
প্রদর্শনীতে রাখা ক্যাটালগ ও শিল্পীর নিজস্ব বক্তব্য থেকে জানা যায়, এটি কেবল নদীর দৃশ্যরূপ নয়, বরং মানুষের ভেতরের নদীর এক গভীর অন্বেষণ।
শিল্পী রাশিদ খান তাঁর চিত্রভাবনা ও শৈশব স্মৃতি ব্যক্ত করে বলেন, “আমাদের কমবেশি সবার জীবনেই নদী কোনো না কোনোভাবে জড়িয়ে আছে। কারও শৈশবে, কারও কৈশোরে, কারও স্মৃতিতে, আবার কারও জীবন ও জীবিকার সঙ্গে প্রতিদিনের বাসসংস্থানে। ছোটবেলায় নানিবাড়ি থেকে দাদিবাড়ি যাওয়ার পথে পানগুছি নদীতে যে দুই ঘণ্টা সময় কাটত—সূর্যের আলোয় নদীর স্রোত, রাতের পূর্ণিমার আলোয় নদীর রূপ, আর দূর জনপদের যে দৃশ্যপট দেখেছি, তা আজও আমার স্মৃতির মণিকোঠায় রয়ে গেছে। নদী বলতে আমরা শুধু দৃশ্যমান জলধারা বুঝি না; দৃশ্যমান নদীর বাইরে যদি তার অনুভূতি বা চেতনাকে দেখতে চাই—তবে নদী হলো মানুষের জীবন, স্মৃতি, সংস্কৃতি ও প্রবাহমান সময়ের এক চিরন্তন ব্যাকরণ। আমার ক্যানভাসে আমি নদীকে শুধু আঁকতে চাইনি; নদী কীভাবে মানুষের চেতনা ও সময়ের নীরব সাক্ষী হয়ে থাকে, নদীকে একটি ‘লেন্স’ (LENS) হিসেবে ব্যবহার করে সেই জীবনবোধের প্রতিফলনই এখানে খুঁজে ফেরার চেষ্টা করেছি।”
দেশের প্রথাবিরোধী শিল্পচর্চা ও অবকাঠামো নিয়ে রাশিদ খান আরও জোর দিয়ে বলেন, সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর উচিত শিল্প ও সাংস্কৃতিক উদ্যোগগুলোতে ব্যবস্থাপনার প্রসার ঘটানো এবং আন্তর্জাতিক মানের গ্যালারি ও পৃষ্ঠপোষকতা বাড়লে আমাদের শিল্পের সম্ভাবনা আরও দ্রুত এগিয়ে যাবে।
পুরো আয়োজনের কিউরেটোরিয়াল অনুসন্ধান, গ্রন্থনা ও লেখায় যুক্ত রয়েছেন শিল্পী ও শিল্প-লেখক জাভেদ জলিল (JJ), যিনি এই প্রদর্শনীকে ‘দ্য এনালগ ড্রিমার’ এবং নদী ও চিত্রশিল্পীর ভেতরের লেনদেনের স্থান হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।
জাভেদ জলিল তাঁর কিউরেটোরিয়াল মন্তব্যে বলেন, “নদী এই ভূখণ্ডকে নদীর দেশ বানিয়েছে—সে যেন মানব বসতির এক প্রাকৃতিক স্থপতি। এই প্রদর্শনীতে ছবি ও শব্দের মেলবন্ধনে আমরা এমন এক স্থান বা সংযোগবিন্দু তৈরি করতে চেয়েছি যেখানে নদী এসে আমাদের সঙ্গে মেলে এবং আমরা গিয়ে নদীর সঙ্গে মিলি। রাশিদের ক্যানভাসে রেখা, রঙের আস্তর ও শারীরিক স্পন্দন সরাসরি সংবেদনশীলতায় রূপ নিয়েছে। এখানে পেইন্টিং এবং আমার রচিত শব্দাবলী দুটি ভিন্ন মাধ্যম হয়েও পরস্পরকে উদ্দীপিত করে একটি নতুন অনুভূতির উন্মোচন ঘটায়। এটি কেবল ছবি দেখা নয়, নদীর নিরবচ্ছিন্ন প্রবাহের সঙ্গে নিজেদের অন্তরের শূন্যতা ও প্রশ্নের মুখোমুখি হওয়া।”
প্রদর্শনী চলাকালে প্রতিদিন বিকেল ৩টা থেকে রাত ৮টআ পর্যন্ত গ্যালারি সকলের জন্য উন্মুক্ত থাকবে। এর পাশাপাশি প্রতিদিন সন্ধ্যা ৭ টায় নদীকে কেন্দ্র করে রানিংভাবে বিশেষ সান্ধ্যকালীন আড্ডা ও সাংস্কৃতিক পর্বগুলো অনুষ্ঠিত হবে।
৬ নভেম্বর শুক্রবার ‘নদী গান’, ৭ নভেম্বর শনিবার ‘নদী সাহিত্য’, ৮ নভেম্বর রবিবার ‘নদী কথা’, ৯ নভেম্বর সোমবার ‘নদী সুর’, ১০ নভেম্বর মঙ্গলবার বিকেল ৩:০০ টায় জাভেদ জলিলের পরিচালনায় বিশেষ আর্ট ওয়ার্কশপ ‘Art in Everyday Life’ এবং সন্ধ্যায় ‘নদী পাঠ’, ১১ নভেম্বর বুধবার ‘নদী কথা’, ১২ নভেম্বর বৃহস্পতিবার ‘নদী গল্প’, ১৩ নভেম্বর শুক্রবার ‘নদী সুর’, ১৪ নভেম্বর শনিবার ‘নদী পাঠ’ এবং ১৫ নভেম্বর রবিবার সমাপনী সন্ধ্যায় ‘নদীলিপি’ শীর্ষক বিশেষ আড্ডার মধ্য দিয়ে এই প্রদর্শনীটি সম্পন্ন হবে।
