শহরের গাছ কমলেও কাটেনি পাখির মায়া : রামেকের বাদাম গাছে শামুকখোলের রাজ্য

আপেল মাহমুদ:
একপাশে হাসপাতালের সাইরেন আর ব্যস্ত সড়কের হর্ন, অন্যপাশে ডালে ডালে পাখির ডানার দোলাচল ও কিচিরমিচির। নগরায়ণ ও উন্নয়নের ধাক্কায় রাজশাহী যখন একটু একটু করে তার ঐতিহাসিক সবুজ রূপ হারাচ্ছে, ঠিক তখনই রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালের প্রধান সড়ক সংলগ্ন প্রকাণ্ড বাদাম গাছটিতে গড়ে উঠেছে প্রকৃতির এক একাকী অভয়ারণ্য। সুউচ্চ এই গাছটির ডালে ডালে এখন শুধুই ‘এশীয় শামুকখোল’ পাখির বিচরণ।
সরেজমিনে শনিবার দুপুরে দেখা যায়, সড়ক সংলগ্ন বিশাল বাদাম গাছটির চওড়া ডালগুলোতে শামুকখোল পাখির দল রোদ পোহাচ্ছে, ডানা মেলছে আর ছানাদের নিয়ে মেতে উঠছে খুনসুটিতে। গাছটিতে কাদা আর ছোট ডালপালা দিয়ে নিপুণ ছন্দে তারা গড়ে তুলেছে নিরাপদ আবাসন। ব্যস্ত সড়ক দিয়ে যাতায়াতকারী পথচারী, হাসপাতালের কর্মী এবং রোগী ও তাঁদের স্বজনেরা থমকে দাঁড়িয়ে উপভোগ করছেন প্রকৃতির এই অনাবিল দৃশ্য। অনেকেই আবেগপ্লুত হয়ে মুঠোফোনে ফ্রেমবন্দী করছেন পাখির ডানায় জমে ওঠা এই অপরূপ মুহূর্ত।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এশীয় শামুকখোল একটি বিশেষ ধরনের জলচর পাখি। এদের ঠোঁটের গঠন অন্য পাখির চেয়ে আলাদা—উপরের ও নিচের ঠোঁটের মাঝে কিছুটা ফাঁকা জায়গা থাকে, যার সাহায্যে এরা সহজে শামুক ও ঝিনুকের শক্ত খোলস ভেঙে ভেতরের মাংসল অংশ খেতে পারে। প্রজনন মৌসুমে এরা দলবেঁধে উঁচু ও ছড়ানো ডালে বাসা তৈরি করে বংশবৃদ্ধি করে।
তবে স্থানীয়দের মনে এই সৌন্দর্যের পাশাপাশি রয়েছে কিছুটা উদ্বেগও। একসময় ‘বার্ডশাহী শহর’ নামে পরিচিত পরিবেশবান্ধব রাজশাহীর প্রাণ ছিল এর সুবিশাল বৃক্ষরাজি। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নগরায়ণ, আধুনিকায়ন, সৌন্দর্যায়ন কিংবা সড়ক প্রশস্ত করার অজুহাতে শহরের বহু প্রাচীন ও প্রকাণ্ড গাছ কেটে ফেলা হয়েছে। অপরিকল্পিত এই বৃক্ষছেদনের কারণে পাখিরাও হারাচ্ছে তাদের প্রাকৃতিক নিরাপদ ঠিকানা। এমন বাস্তবতায় রামেক প্রাঙ্গণে টিকে থাকা হাতেগোনা কয়েকটি বিশাল গাছ পাখিদের জন্য যেন শেষ আশ্রয়ের অভয়ারণ্য হয়ে উঠেছে।
রামেক হাসপাতালের সামনে দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় মুগ্ধতা প্রকাশ করে আতিকুর রহমান নামের এক পথচারী বলেন,”প্রতিদিন এই রাস্তা দিয়ে কাজে যাই। গাছের দিকে তাকালে নিমিষেই মনটা ভালো হয়ে যায়। শত শত পাখির ওড়াওড়ি আর কলকাকলি শুনলে শহরের ব্যস্ততার সব ক্লান্তি যেন দূর হয়ে যায়। মনে হয়, কংক্রিটের এই শহরে পাখিরা অন্তত মুক্তভাবে ডানা মেলার একটু জায়গা পেয়েছে।”
হাসপাতালে চিকিৎসাধীন এক স্বজন মোছা. রুকসানা খাতুন বলেন, “গাছের ডালে পাখিরা যেভাবে ছানাদের লালন-পালন করছে আর ডানা মেলে বসে আছে, তা না দেখলে বিশ্বাস করা যায় না। প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ এসে এদের ছবি তোলে। তবে শহরজুড়ে যেভাবে একের পর এক গাছ কাটা হচ্ছে, তাতে এদের বাঁচিয়ে রাখতে হাসপাতালের এই বড় গাছগুলো রক্ষা করা ভীষণ জরুরি।”
দেশি বাদাম ও কড়ই গাছের মতো ছড়ানো ডালপালা শামুকখোলের বাসা বাঁধার জন্য অত্যন্ত উপযোগী। পরিবেশ সচেতন নাগরিক ও পাখি বিশেষজ্ঞদের মতে, পাখিদের এই প্রাকৃতিক ডেরা বজায় রাখতে এবং ঐতিহ্যবাহী ‘বার্ডশাহী’ ও ‘চিরসবুজ রাজশাহী’র সুনাম টিকিয়ে রাখতে উন্নয়নকাজের নামে বৃক্ষ নিধন বন্ধের পাশাপাশি পুরনো বৃক্ষরাজি সংরক্ষণ করা জরুরি।
