উত্তরাঞ্চলের বৃহৎ সবজি মোকাম মহাস্থান হাট : নেই সরকারি টোল তালিকা, প্রান্তিক কৃষকদের ‘ধলতা’র ফাঁদ

উত্তরবঙ্গের বৃহত্তম সবজির পাইকারি হাট বগুড়ার মহাস্থান। ঢাকা-রংপুর মহাসড়কের কোল ঘেঁষে অবস্থিত প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী ও দেশের অন্যতম বৃহৎ সবজির মোকাম মহাস্থান হাটে প্রতিদিন ভোর থেকে দুপুর পর্যন্ত কোটি কোটি টাকার সবজি কেনাবেচা হয়। বগুড়া ছাড়াও পার্শ্ববর্তী জয়পুরহাট, গাইবান্ধা ও নওগাঁ জেলার হাজার হাজার প্রান্তিক চাষি তাঁদের কষ্টার্জিত ফসল নিয়ে ছুটে আসেন এই হাটে। কিন্তু এই বিশাল অর্থনৈতিক কর্মযজ্ঞের পেছনে লুকিয়ে আছে এক নির্মম শোষণ ও অব্যবস্থাপনার গল্প। সরকারি নিয়ম অনুযায়ী হাটের প্রধান প্রধান স্থানে সরকার নির্ধারিত টোল বা খাজনা আদায়ের তালিকা (টোল চার্ট) ঝুলিয়ে রাখার বাধ্যবাধকতা থাকলেও মহাস্থান হাটে তার কোনো অস্তিত্ব নেই। ফলে কৃষকরা প্রতিনিয়ত শিকার হচ্ছেন চরম অনিয়ম ও অতিরিক্ত টোল আদায়ের।
সোমবার সকাল ১০টায় হাটের সরেজমিনে ঘুরে এবং স্থানীয় কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে যে চিত্র পাওয়া যায়, তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক।
হাটের চারপাশে ঘুরে দেখা যায়, কোথাও কোনো সরকারি টোল চার্ট টাঙানো নেই। কৃষকরা জানেনই না ঠিক কত টাকা সরকারি টোল নির্ধারণ করা হয়েছে। ইজারাদারের লোকজন নিজেদের মনগড়া নিয়মে একেক জনের কাছ থেকে একেক হারে টাকা আদায় করছে।
অন্য দিকে অসহায় কৃষকরা দীর্ঘশ্বাস ফেলিয়ে এই প্রতিবেদককে জানান, “ধলতা’র নামে নীরব ডাকাতি চলছে। এই হাটের সবচেয়ে বড় অন্যায়ের নাম ‘ধলতা’। সবজি বিক্রি করতে আসা কৃষকদের প্রতি মণে (৪০ কেজি) আড়তদার ও ব্যাপারীদের অতিরিক্ত ২ কেজি সবজি ফাও বা বিনামূল্যে দিতে বাধ্য করা হয়। অর্থাৎ, একজন কৃষক ২০ মণ সবজি হাটে আনলে মূলত ১৯মণের দাম পান, বাকি ১ মণ সবজি বিভিন্ন অজুহাতে কেটে নেওয়া হয়।
কৃষকদের ভাষ্য, “১০ মণ বরবটি হাটত লিয়ে আনু, ১ মণই ফাও গেল”। কষ্ট করে রোদে পুড়ে ফসল চাষাবাদ করে হাসি মুখে হাটে নিয়ে এসে হাটের ব্যবস্থাপনা দেখে চোখে পানি ফেলে তাদের বাড়ি ফিরতে হয়।
স্থানীয় সচেতন মহল ও কৃষকদের মতে, টোল চার্ট না টাঙানোর পেছনে রয়েছে গভীর সিন্ডিকেট চক্রের হাত। টোল তালিকা টাঙানো থাকলে সাধারণ কৃষক ও পাইকাররা সচেতন হয়ে যাবেন এবং ইজারাদারের লোকজন বাড়তি টাকা দাবি করতে পারবে না।
এদিকে স্থানীয় এলাকাবাসী জানান, মহাস্থান হাট আমাদের গর্ব ও ঐতিহ্য। কিন্তু এ হাট থেকে ১০ কেজি আলু বা পেঁয়াজ বাড়ীর খাওয়ার জন্য নিলে স্থানীয় হিসাবে সেখানেও গুনতে হয় খাজনা। সামান্য ১০ কেজির সবজি কিনে হাট থেকে বের হতে খাজনা না দিলে প্রতিদিন বাকবিতন্ডার মত ঘটনা ঘটছে।
মহাস্থান হাটে প্রতি বছর কোটি কোটি টাকার রাজস্ব পেলেও স্থানীয় শিবগঞ্জ উপজেলা প্রশাসন ও জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে কার্যকর এবং নিয়মিত তদারকির অভাব রয়েছে।
এদিকে স্থানীয়রা আরও বলেন, হাটের ইজারাদারের পেছনে জড়িত থাকেন স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিবর্গ। ফলে তাঁদের অন্যায়ের বিরুদ্ধে সাধারণ কৃষক বা আড়তদারদের পক্ষে মুখ খোলার সাহস থাকে না।
অনুসন্ধানে দেখা যায়, টোল আদায়ের তালিকা না থাকার অন্তরালে সদ্য কুরবানি ঈদে মহাস্থানহাটের গরু-ছাগলের হাসিল (খাজনা) অতিতের রেকর্ড ভেঙেছে। সরকার নির্ধারিত বড় গরু প্রতি ৮০০ টাকা খাজনা হলেও এখানে গরু প্রতি ১৪০০ টাকা খাজনা নেওয়া হয়েছে। বিষয়টি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জিয়াউর রহমান জানার পর হাটের সরেজমিনে অভিযান চালান। পরে ইউএনও এর উপস্থিতে ৮০০ টাকা লোক দেখানো খাজনা নিলেও ইউএনও হাট ত্যাগ করার পরপরই খাজনা ১২০০ টাকা নেওয়া হয়। বাজার মূল্যের চরম ব্যবধান ও ভোক্তাদের ভোগান্তি মহাস্থান হাটের এই টোল ও কমিশন নৈরাজ্যর প্রভাব সরাসরি গিয়ে পড়ছে সাধারণ ক্রেতা বা ভোক্তাদের পকেটে।
সচেতনমহল জানিয়েছেন, মহাস্থান হাটের সংকট উত্তরণ মহাস্থান হাটের কমপক্ষে ৮টি গুরুত্বপূর্ণ ও জনাকীর্ণ স্থানে বড় আকারের দৃশ্যমান ডিজিটাল বা অ্যানালগ বোর্ডে সরকার নির্ধারিত বাংলা টোল চার্ট ঝুলিয়ে দিতে হবে। ফাও সবজি আদায়ের এই বেআইনি ও অনৈতিক ‘ধলতা’ প্রথা অবিলম্বে কঠোর হাতে বন্ধ করতে হবে। ওজন নিশ্চিত করতে ডিজিটাল স্কেলের ব্যবহার বাধ্যতামূলক করতে হবে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এবং জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের মাধ্যমে হাটের দিনগুলোতে নিয়মিত মোবাইল কোর্ট বা ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করতে হবে।দীর্ঘমেয়াদে টোল আদায়ের প্রক্রিয়াটি ক্যাশলেস বা ডিজিটাল করার উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে, যাতে সরাসরি সরকারি কোষাগারে সঠিক পরিমাণ অর্থ জমা হয় এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমে। হাটের ভেতরে কৃষকদের যেকোনো অভিযোগ দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য একটি সার্বক্ষণিক প্রশাসনিক অভিযোগ বুথ স্থাপন করা দরকার।
সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আইনি বিধান অনুযায়ী জানা যায়, সরকারি হাট-বাজার (স্থাপন ও ব্যবস্থাপনা) যেকোনো সরকারি ইজারাপ্রাপ্ত হাটের দৃশ্যমান স্থানে সরকার নির্ধারিত টোল বা খাজনার তালিকা প্রদর্শন করা বাধ্যতামূলক। এর ব্যত্যয় ঘটলে ইজারা বাতিলসহ কঠোর জরিমানার বিধান রয়েছে।
এ বিষয়ে মহাস্থান হাটের ইজাদার শাহাদত হোসেনের সাথে কথা বললে তিনি জানান, হাটের তালিকা ছিল তা কিভাবে গায়েব হয়েছে জানি না। তবে এটি বাঁশ দিয়ে টাঙানোর ফলে গোড়া পচে নষ্ট হয়ে যাওয়ার ফলে সেটি এখন দৃশ্যমান নেই। এবং ধলতার বিষয়টি আড়তদারদের ওপর চাপিয়ে দেন। সবজি পরিবহনের সময় কিছু সবজি নষ্ট বা পচে যায় বিধায় ব্যাপারীদের সুবিধার্থে এই ‘ধলতা’ নেওয়া হয় বলে তিনি দাবি করেন।
এ বিষয়ে শিবগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জিয়াউর রহমানের সাথে কথা বললে তিনি বলেন, মহাস্থান হাটের অনিয়মের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। এবং দ্রুত টোল তালিকা টাঙানো হবে।
