ঢাকা ০৪:৩৭ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ০৪ ফেব্রুয়ারী ২০২৩, ২১ মাঘ ১৪২৯ বঙ্গাব্দ
বিজ্ঞপ্তি :
দেশের জনপ্রিয় সর্বাধুনিক নিয়ম-নীতি অনুসরণকৃত রাজশাহী কর্তৃক প্রকাশিত নতুনধারার অনলাইন নিউজ পোর্টাল 'যমুনা প্রতিদিন ডট কম' এ সারাদেশে প্রতিনিধি নিয়োগ চলছে।
সংবাদ শিরোনাম :
রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ে সুশাসন প্রতিষ্ঠার নিমিত্তে অংশীজনের সভা অনুষ্ঠিত রাজশাহীতে বীর মুক্তিযোদ্ধা শাহাবুদ্দিন আহমেদ ও কবির বিন আনোয়ারকে সংবর্ধনা রাজশাহীতে চিত্রশিল্পী শাহাবুদ্দিন আহমেদের নামে আর্ট গ্যালারি করা হবে : রাসিক মেয়র ভারতের প্রমোদতরী ‘গঙ্গা বিলাস’ সুন্দরবনে ৫৯ বিজিবি কর্তৃক শিয়ালমারা ও আজমতপুর সীমান্তে বিদেশী মদ ও ফেন্সিডিল আটক রামপাল তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের চুরি হওয়া মেশিন উদ্ধার,আটক ৪ মোরেলগঞ্জে স্হানীয় সাংসদের পক্ষ থেকে শীতবস্ত্র বিতরণ সৈয়দ নজরুল ইসলামের ব্যাক্তিগত উদ্যোগে ৩২ হাজার কম্বল বিতরণ পাইকগাছা উপজেলা স্বেচ্ছাসেবকলীগের উদ্যোগে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত পদ্মায় অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের দায়ে ট্রাক্টর মালিকের জেল

বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ করতে হবে

শ্যামল শীল,অতিথি লেখকঃ
  • আপডেট সময় : ০১:৫৬:৩০ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৪ জানুয়ারী ২০২৩ ৮৫ বার পড়া হয়েছে
যমুনা প্রতিদিন অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

‘একটি সুস্থ জাতি পেতে প্রয়োজন একজন শিক্ষিত মা’ এই উক্তিটি প্রখ্যাত মনীষী ও দার্শনিক নেপোলিয়ন বোনাপার্টের।অথচ একুশ শতকে এসেও বাংলাদেশের ৬৬ শতাংশ নারী এখনো শিক্ষা থেকে বঞ্চিত।আর এর প্রধান কারণ বাল্যবিবাহ।আগামী প্রজন্মের সুস্থভাবে বেড়ে ওঠা এবং সুনাগরিক হিসেবে গড়ে উঠতেও বাল্যবিবাহ একটি বড় বাধা।

নারীর ক্ষমতায়নে প্রধানতম বাধা হিসেবেও বাল্যবিবাহকে চিহ্নিত করা যায়।বাল্যবিবাহের শিকার ছেলে বা মেয়ে; অধিকাংশ ক্ষেত্রে উচ্চ শিক্ষা এমনকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে শিশু শিক্ষা থেকেও বঞ্চিত হয়।ফলে শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত শিশু, কিশোরী এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে কিশোররাও উন্নত জীবন ব্যবস্থা, আধুনিক প্রযুক্তিগত তথ্যপ্রবাহ থেকে বঞ্চিত।

জাতিসংঘ শিশু তহবিল (ইউনিসেফ) কর্তৃক প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী বাংলাদেশে ১৮ বছরের আগে ৬৬ শতাংশ মেয়ে এবং একই বয়সের ৫ শতাংশ ছেলের বিয়ে হচ্ছে।

ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশে ১০-১৯ বছর বয়সের দুই-তৃতীয়াংশ কিশোরী বাল্যবিবাহের শিকার হয়।

সেভ দ্য চিলড্রেন-এর ২০১০ সালে প্রকাশিত এক প্রতিবেদন অনুযায়ী বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলের ৬৯ শতাংশ নারীর ১৮ বছর বয়স হওয়ার আগেই বিয়ে হয়ে যাচ্ছে। জাতীয় কন্যা শিশু অ্যাডভোকেসি ফোরাম-এর তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশে বাল্যবিবাহের হার ২০০৯ সালে ছিল ৬৩ শতাংশ, যা ২০১৩ সালে এসে বেড়ে ৬৬ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।

আমাদের দেশে বহুল আলোচিত সামাজিক সমস্যা হচ্ছে বাল্যবিবাহ। বাল্যবিবাহের অনেক কারণ রয়েছে।

উল্লেখযোগ্য কারণ হলো-মেয়েদের বোঝাস্বরূপভাব, ইভটিজিং, অর্থাভাব, সামাজিক অসচেতনতা, যৌন হয়রানি, কুসংস্কার ইত্যাদি। নির্দিষ্ট সময়ে চাহিদার ভিত্তিতেই মানুষজন বিয়ের পিঁড়িতে বসে কিন্তু বাল্যবিবাহের ফলে আঁধারে হারিয়ে যায় কিশোরীদের সুন্দর এক আগামীর স্বপ্ন। বিবাহ মানব জীবনের অতি প্রয়োজনীয় হলেও স্বল্প বয়সে বিয়ে কিংবা বাল্যবিবাহের মাধ্যমে সমাজ ও ব্যক্তি জীবনে খারাপ অবস্থার সৃষ্টি করেছে।বাল্যবিবাহের ফলে মানুষের মৌলিক চাহিদার তেমন ক্ষতি না হলেও অকালে ঝরে থাকে একটি শিশুর সোনালি ভবিষ্যৎ রঙিন স্বপ্নের ঘুড়ি নিমিষেই সুতা ছিঁড়ে যায় আর চলে অজানা কোনো এক গন্তব্যে।

বর্তমানে বাংলাদেশে প্রতিদিন অনেক বাল্যবিবাহ হচ্ছে কিন্তু বাল্যবিবাহ আইন থাকার পর এর সঠিক প্রয়োগ নেই। নারী উন্নয়ন বিশেষজ্ঞরা বাল্যবিবাহকে নারী ক্ষমতায়নের পথে অন্তরায় বিবেচনা করেন। নারীর উন্নয়ন ছাড়া দেশ ও জাতির উন্নয়ন অসম্ভব। তথাকথিত নারী উন্নয়ন নিয়ে সন্তুষ্ট থাকলেই হবে না বাস্তব পক্ষে কতটুক উন্নয়ন আর সাফল্যের রাজমুকুট পরার সৌভাগ্য কয়জন নারী পাচ্ছে তা কিন্তু ভাবনার বিষয়।মুকুট পরার অধিকার সবার নেই অকালে ঝরে যায় মুকুটের স্বপ্ন।

ইউনিসেফ পরিচালিত এক জরিপ মতে, বাংলাদেশের মহিলা ও শিশুদের উন্নয়নে অনেক অগ্রগতি অর্জিত হলেও এখনো বিশেষ কিছু ক্ষেত্রে তীব্র বৈষম্য রয়েছে। গ্রাম ও শহরের পরিবারগুলোর মধ্যেও বৈষম্য বিরাজমান বলে জরিপে পাওয়া গেছে।এই জরিপে ৭৯টি সামাজিক নির্দেশক মূল্যায়ন করা হয়েছে, যার মধ্যে ১৬টি হলো সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা বিষয়ক।

এতে দেখা গেছে শিশুমৃত্যুর হার কমানো, শিক্ষা, সঠিক সময়ে বুকের দুধ পান করানো, প্রাক বিদ্যালয়ে উপস্থিতির হার ও বিদ্যালয়ে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার হারে যথেষ্ট অগ্রগতি হলেও এখনো সব ধরনের মানুষের একত্রিত অগ্রগতির ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জ রয়েই গেছে।

গবেষণা ফলাফলে বলা হয়, দেশের ৪২ শতাংশ খর্বাকৃতির মানুষের মধ্যে ৫২.৮ শতাংশই দরিদ্র পরিবার থেকে আসা। সন্তান জন্মদানের সময় দক্ষ স্বাস্থ্যকর্মীর সাহায্য পায় দরিদ্র মায়েদের মাত্র ২৬.৫ শতাংশ। কিন্তু ধনী মায়েদের ৭২.৮ শতাংশই এই সুবিধা পেয়ে থাকে।

১৫ বছরের কম বয়সী মেয়েদের বিয়ের হার সবচেয়ে বেশি, এমন দেশগুলোর শীর্ষ তালিকায় রয়েছে বাংলাদেশ। জাতিসংঘের শিশু বিষয়ক তহবিল ইউনিসেফ এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে।বাংলাদেশে ১৫ বছর হওয়ার আগেই শতকরা ৩৯ শতাংশ মেয়ের এবং ১৮ বছরের মধ্যেই ৭৪ শতাংশ মেয়ের বিয়ে হয়ে যায় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

‘এন্ডিং চাইল্ড ম্যারেজ: প্রোগ্রেস অ্যান্ড প্রোসপেক্টস’ শীর্ষক এ প্রতিবেদনে বাংলাদেশের বাল্যবিবাহের বিভিন্ন দিক উঠে এসেছে। বিশ্বে বাল্যবিবাহের শিকার নারীর সংখ্যা এখন ৭০ কোটিরও বেশি।তাদের প্রতি তিনজনে একজনেরই বিয়ে হয়েছে ১৫ বছর বয়স হওয়ার আগেই।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বে ১৫ বছরের কম বয়সী মেয়েদের বাল্যবিবাহের হার সবচেয়ে বেশি।

গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, বাল্যবিবাহের শিকার এসব মেয়ে গর্ভাবস্থায় ও সন্তান প্রসবের সময় উপযুক্ত স্বাস্থ্য সেবা পায় না।এরা গর্ভধারণে শারীরিকভাবে উপযুক্তও নয়।ফলে মা এবং শিশুর জীবন ঝুঁকিপূর্ণ থাকে।

এতে দেখা যায়, বাংলাদেশে ১৫ বছরের কম বয়সে বিবাহিত মেয়েদের মধ্যে ২৪ বছরে পৌঁছানোর আগে ৩ বা ততোধিক বাচ্চার মা হওয়ার হার ২০ শতাংশের বেশি।

প্রতিবেদনে আরো জানানো হয়েছে, দক্ষিণ এশিয়া এবং সাব-সাহারা অঞ্চলে বাল্যবিবাহ মেয়েদের জন্য সাধারণ ব্যাপার।

বাল্যবিবাহে শীর্ষ ১০টি দেশের মধ্যে রয়েছে : নাইজার, বাংলাদেশ, চাদ, মালি, মধ্য আফ্রিকান প্রজাতন্ত্র, ভারত, গিনি, ইথিওপিয়া, বুরকিনা ফাসো ও নেপাল।

নেপোলিয়ন বোনাপার্ট বলেছিলেন- ‘আমাকে শিক্ষিত মা দাও, আমি শিক্ষিত জাতি উপহার দেব।’ প্রখ্যাত এই বাণী যেন হারিয়ে যাচ্ছে।সভ্যতায় ও সময়ের ছুটে চলায়। বাল্যবিবাহের মাধ্যমে একজন নারীর শিক্ষার দ্বার রুদ্ধ করা হচ্ছে। যে বয়সে নিজেকে গঠন করার বয়স সেই বয়সে দায়িত্ব নিত একটি পরিবারের।সেই নারী কি পারবে নিজেকে এগিয়ে নিতে? বাল্যবিবাহ বন্ধ করতে প্রয়োজন সামাজিক সচেতনতা এবং আইনের সঠিক প্রয়োগ।

আইনের সঠিক প্রয়োগ ও বাস্তবায়নের মাধ্যমেই নারী এগিয়ে যাবে তার গন্তব্যে আর আমাদের দেশ এগিয়ে যাবে নিজস্ব ধারায়। বাল্যবিবাহ কেবল একটি নারীর জীবনকে অন্ধকার ও দুর্বিষহ জীবনযাপনের দিকে ধাবিত করে।

বাল্যবিবাহ রোধে সরকার ও স্থানীয় প্রশাসনের প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়ার সময়ের অন্যতম দাবি।বাল্যবিবাহ একদিকে আইন এবং সংবিধানের লঙ্ঘন, অন্যদিকে বাল্যবিবাহের বর ও কনেকে তার ব্যক্তি স্বাধীনতা থেকে বঞ্চিত করা হয়।

বাল্যবিবাহের উদ্বেগজনক পরিণতি যেহেতু পরিবার, সমাজ তথা রাষ্ট্রের জন্য ক্ষতিকর সেহেতু এটি অবশ্যই বন্ধ হওয়া প্রয়োজন। এ জন্য প্রয়োজনে নতুন আইন প্রণয়ন করাসহ আপামর জনসাধারণকে এ ব্যাপারে সচেতনপূর্বক সম্পৃক্ত করতে হবে।আর নতুন আইন প্রণয়নের থেকে গুরুত্বপূর্ণ হলো আইনের প্রয়োগ।কারণ আমাদের দেশে আইন আছে; কিন্তু আইনের প্রয়োগ নেই।তাই বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে আমাদের সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।

লেখক: শিক্ষার্থী, ইতিহাস বিভাগ,জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ করতে হবে

আপডেট সময় : ০১:৫৬:৩০ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৪ জানুয়ারী ২০২৩

‘একটি সুস্থ জাতি পেতে প্রয়োজন একজন শিক্ষিত মা’ এই উক্তিটি প্রখ্যাত মনীষী ও দার্শনিক নেপোলিয়ন বোনাপার্টের।অথচ একুশ শতকে এসেও বাংলাদেশের ৬৬ শতাংশ নারী এখনো শিক্ষা থেকে বঞ্চিত।আর এর প্রধান কারণ বাল্যবিবাহ।আগামী প্রজন্মের সুস্থভাবে বেড়ে ওঠা এবং সুনাগরিক হিসেবে গড়ে উঠতেও বাল্যবিবাহ একটি বড় বাধা।

নারীর ক্ষমতায়নে প্রধানতম বাধা হিসেবেও বাল্যবিবাহকে চিহ্নিত করা যায়।বাল্যবিবাহের শিকার ছেলে বা মেয়ে; অধিকাংশ ক্ষেত্রে উচ্চ শিক্ষা এমনকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে শিশু শিক্ষা থেকেও বঞ্চিত হয়।ফলে শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত শিশু, কিশোরী এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে কিশোররাও উন্নত জীবন ব্যবস্থা, আধুনিক প্রযুক্তিগত তথ্যপ্রবাহ থেকে বঞ্চিত।

জাতিসংঘ শিশু তহবিল (ইউনিসেফ) কর্তৃক প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী বাংলাদেশে ১৮ বছরের আগে ৬৬ শতাংশ মেয়ে এবং একই বয়সের ৫ শতাংশ ছেলের বিয়ে হচ্ছে।

ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশে ১০-১৯ বছর বয়সের দুই-তৃতীয়াংশ কিশোরী বাল্যবিবাহের শিকার হয়।

সেভ দ্য চিলড্রেন-এর ২০১০ সালে প্রকাশিত এক প্রতিবেদন অনুযায়ী বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলের ৬৯ শতাংশ নারীর ১৮ বছর বয়স হওয়ার আগেই বিয়ে হয়ে যাচ্ছে। জাতীয় কন্যা শিশু অ্যাডভোকেসি ফোরাম-এর তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশে বাল্যবিবাহের হার ২০০৯ সালে ছিল ৬৩ শতাংশ, যা ২০১৩ সালে এসে বেড়ে ৬৬ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।

আমাদের দেশে বহুল আলোচিত সামাজিক সমস্যা হচ্ছে বাল্যবিবাহ। বাল্যবিবাহের অনেক কারণ রয়েছে।

উল্লেখযোগ্য কারণ হলো-মেয়েদের বোঝাস্বরূপভাব, ইভটিজিং, অর্থাভাব, সামাজিক অসচেতনতা, যৌন হয়রানি, কুসংস্কার ইত্যাদি। নির্দিষ্ট সময়ে চাহিদার ভিত্তিতেই মানুষজন বিয়ের পিঁড়িতে বসে কিন্তু বাল্যবিবাহের ফলে আঁধারে হারিয়ে যায় কিশোরীদের সুন্দর এক আগামীর স্বপ্ন। বিবাহ মানব জীবনের অতি প্রয়োজনীয় হলেও স্বল্প বয়সে বিয়ে কিংবা বাল্যবিবাহের মাধ্যমে সমাজ ও ব্যক্তি জীবনে খারাপ অবস্থার সৃষ্টি করেছে।বাল্যবিবাহের ফলে মানুষের মৌলিক চাহিদার তেমন ক্ষতি না হলেও অকালে ঝরে থাকে একটি শিশুর সোনালি ভবিষ্যৎ রঙিন স্বপ্নের ঘুড়ি নিমিষেই সুতা ছিঁড়ে যায় আর চলে অজানা কোনো এক গন্তব্যে।

বর্তমানে বাংলাদেশে প্রতিদিন অনেক বাল্যবিবাহ হচ্ছে কিন্তু বাল্যবিবাহ আইন থাকার পর এর সঠিক প্রয়োগ নেই। নারী উন্নয়ন বিশেষজ্ঞরা বাল্যবিবাহকে নারী ক্ষমতায়নের পথে অন্তরায় বিবেচনা করেন। নারীর উন্নয়ন ছাড়া দেশ ও জাতির উন্নয়ন অসম্ভব। তথাকথিত নারী উন্নয়ন নিয়ে সন্তুষ্ট থাকলেই হবে না বাস্তব পক্ষে কতটুক উন্নয়ন আর সাফল্যের রাজমুকুট পরার সৌভাগ্য কয়জন নারী পাচ্ছে তা কিন্তু ভাবনার বিষয়।মুকুট পরার অধিকার সবার নেই অকালে ঝরে যায় মুকুটের স্বপ্ন।

ইউনিসেফ পরিচালিত এক জরিপ মতে, বাংলাদেশের মহিলা ও শিশুদের উন্নয়নে অনেক অগ্রগতি অর্জিত হলেও এখনো বিশেষ কিছু ক্ষেত্রে তীব্র বৈষম্য রয়েছে। গ্রাম ও শহরের পরিবারগুলোর মধ্যেও বৈষম্য বিরাজমান বলে জরিপে পাওয়া গেছে।এই জরিপে ৭৯টি সামাজিক নির্দেশক মূল্যায়ন করা হয়েছে, যার মধ্যে ১৬টি হলো সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা বিষয়ক।

এতে দেখা গেছে শিশুমৃত্যুর হার কমানো, শিক্ষা, সঠিক সময়ে বুকের দুধ পান করানো, প্রাক বিদ্যালয়ে উপস্থিতির হার ও বিদ্যালয়ে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার হারে যথেষ্ট অগ্রগতি হলেও এখনো সব ধরনের মানুষের একত্রিত অগ্রগতির ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জ রয়েই গেছে।

গবেষণা ফলাফলে বলা হয়, দেশের ৪২ শতাংশ খর্বাকৃতির মানুষের মধ্যে ৫২.৮ শতাংশই দরিদ্র পরিবার থেকে আসা। সন্তান জন্মদানের সময় দক্ষ স্বাস্থ্যকর্মীর সাহায্য পায় দরিদ্র মায়েদের মাত্র ২৬.৫ শতাংশ। কিন্তু ধনী মায়েদের ৭২.৮ শতাংশই এই সুবিধা পেয়ে থাকে।

১৫ বছরের কম বয়সী মেয়েদের বিয়ের হার সবচেয়ে বেশি, এমন দেশগুলোর শীর্ষ তালিকায় রয়েছে বাংলাদেশ। জাতিসংঘের শিশু বিষয়ক তহবিল ইউনিসেফ এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে।বাংলাদেশে ১৫ বছর হওয়ার আগেই শতকরা ৩৯ শতাংশ মেয়ের এবং ১৮ বছরের মধ্যেই ৭৪ শতাংশ মেয়ের বিয়ে হয়ে যায় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

‘এন্ডিং চাইল্ড ম্যারেজ: প্রোগ্রেস অ্যান্ড প্রোসপেক্টস’ শীর্ষক এ প্রতিবেদনে বাংলাদেশের বাল্যবিবাহের বিভিন্ন দিক উঠে এসেছে। বিশ্বে বাল্যবিবাহের শিকার নারীর সংখ্যা এখন ৭০ কোটিরও বেশি।তাদের প্রতি তিনজনে একজনেরই বিয়ে হয়েছে ১৫ বছর বয়স হওয়ার আগেই।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বে ১৫ বছরের কম বয়সী মেয়েদের বাল্যবিবাহের হার সবচেয়ে বেশি।

গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, বাল্যবিবাহের শিকার এসব মেয়ে গর্ভাবস্থায় ও সন্তান প্রসবের সময় উপযুক্ত স্বাস্থ্য সেবা পায় না।এরা গর্ভধারণে শারীরিকভাবে উপযুক্তও নয়।ফলে মা এবং শিশুর জীবন ঝুঁকিপূর্ণ থাকে।

এতে দেখা যায়, বাংলাদেশে ১৫ বছরের কম বয়সে বিবাহিত মেয়েদের মধ্যে ২৪ বছরে পৌঁছানোর আগে ৩ বা ততোধিক বাচ্চার মা হওয়ার হার ২০ শতাংশের বেশি।

প্রতিবেদনে আরো জানানো হয়েছে, দক্ষিণ এশিয়া এবং সাব-সাহারা অঞ্চলে বাল্যবিবাহ মেয়েদের জন্য সাধারণ ব্যাপার।

বাল্যবিবাহে শীর্ষ ১০টি দেশের মধ্যে রয়েছে : নাইজার, বাংলাদেশ, চাদ, মালি, মধ্য আফ্রিকান প্রজাতন্ত্র, ভারত, গিনি, ইথিওপিয়া, বুরকিনা ফাসো ও নেপাল।

নেপোলিয়ন বোনাপার্ট বলেছিলেন- ‘আমাকে শিক্ষিত মা দাও, আমি শিক্ষিত জাতি উপহার দেব।’ প্রখ্যাত এই বাণী যেন হারিয়ে যাচ্ছে।সভ্যতায় ও সময়ের ছুটে চলায়। বাল্যবিবাহের মাধ্যমে একজন নারীর শিক্ষার দ্বার রুদ্ধ করা হচ্ছে। যে বয়সে নিজেকে গঠন করার বয়স সেই বয়সে দায়িত্ব নিত একটি পরিবারের।সেই নারী কি পারবে নিজেকে এগিয়ে নিতে? বাল্যবিবাহ বন্ধ করতে প্রয়োজন সামাজিক সচেতনতা এবং আইনের সঠিক প্রয়োগ।

আইনের সঠিক প্রয়োগ ও বাস্তবায়নের মাধ্যমেই নারী এগিয়ে যাবে তার গন্তব্যে আর আমাদের দেশ এগিয়ে যাবে নিজস্ব ধারায়। বাল্যবিবাহ কেবল একটি নারীর জীবনকে অন্ধকার ও দুর্বিষহ জীবনযাপনের দিকে ধাবিত করে।

বাল্যবিবাহ রোধে সরকার ও স্থানীয় প্রশাসনের প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়ার সময়ের অন্যতম দাবি।বাল্যবিবাহ একদিকে আইন এবং সংবিধানের লঙ্ঘন, অন্যদিকে বাল্যবিবাহের বর ও কনেকে তার ব্যক্তি স্বাধীনতা থেকে বঞ্চিত করা হয়।

বাল্যবিবাহের উদ্বেগজনক পরিণতি যেহেতু পরিবার, সমাজ তথা রাষ্ট্রের জন্য ক্ষতিকর সেহেতু এটি অবশ্যই বন্ধ হওয়া প্রয়োজন। এ জন্য প্রয়োজনে নতুন আইন প্রণয়ন করাসহ আপামর জনসাধারণকে এ ব্যাপারে সচেতনপূর্বক সম্পৃক্ত করতে হবে।আর নতুন আইন প্রণয়নের থেকে গুরুত্বপূর্ণ হলো আইনের প্রয়োগ।কারণ আমাদের দেশে আইন আছে; কিন্তু আইনের প্রয়োগ নেই।তাই বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে আমাদের সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।

লেখক: শিক্ষার্থী, ইতিহাস বিভাগ,জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা।